পাহাড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে জানিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অপহরণ, খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে নানা অভিযোগ পেয়েছি। এখানকার মানুষের মনে অসন্তোষ রয়েছে অনেক। এই এলাকায় উন্নয়ন বিঘ্নিত হচ্ছে, সেটা আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি। তবে এখনই হতাশ হয়ে যাওয়ার মতো কিছু হয়নি।’
বুধবার (১৮ জানুয়ারি) সকালে রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট সম্মেলন কক্ষে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উদ্যোগে গণশুনানি আয়োজন হয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে স্থানীয় সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন কামাল উদ্দিন আহমেদ।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস ফি বাড়ানো ও ফি কমানোর আন্দোলন করতে গিয়ে কারাগারে যাওয়া মোস্তাকিম প্রসঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ায় হাঁটার কথা জানিয়েছেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান।
কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছি। তদন্তের মাধ্যমে এটা বের হবে, কেউ কোনও দোষ করেছে কিনা। ইতোমধ্যে একটা প্রতিকার পাওয়া গেছে। যেই ছেলেকে আটক করা হয়েছিল তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে। তার কোনও দোষ ছিল না। ডায়ালাইসিস ফি যা বাড়ানোর কথা ছিল সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে আগের পর্যায়ে রেখেছে সরকার। আমি মনে করি এটি বিরাট প্রতিকার। কাজেই আইনি প্রক্রিয়ায় এগোতে হবে।’
তবে মোস্তাকিমের বিরুদ্ধে করা মামলা চলবে জানিয়ে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘মামলা চলবে। তবে যিনি দোষী সাব্যস্ত হবেন, তিনি যেই হোক তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন আদালত। যার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে তিনি কিংবা কেউ যদি মিথ্যা মামলা করে থাকে তারও বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন আদালত। এক্ষেত্রে আমরা ওই যুবকের সঙ্গে থাকবো।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মানবাধিকার কমিশনের যুগ্ম সচিব নারায়ণ চন্দ সরকার, সদস্য মো. সেলিম রেজা, সদস্য কাওসার আহমেদ, মো. আমিনুল ইসলাম, কংজেরী চৌধুরী, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ ও তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধি।
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি-বাঙালি সবাই মানবাধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়। কিন্তু শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ অবৈধ অস্ত্রের কারণে নিজ বাড়িতে থাকতে পারে না। নিজ বাড়িতে নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার চায়। চুক্তির পর পাহাড়ে শান্তি না ফেরায় পাহাড়ি-বাঙালি উভয়ে অশান্তিতে বসবাস করছেন।
পাহাড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে সব সম্প্রদায়কে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদার মূল কারণ পাহাড়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক শসস্ত্র সংগঠনগুলো। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা না হলে পাহাড়ে কোনোদিন শান্তি ফিরবে না।
চুক্তির পর পাহাড়ে ২৫টির বেশি গণহত্যা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপস্থিতিতে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাহাড়ে পর্যটনের নামে ভূমিহারা
হচ্ছে স্থানীয়রা। এসব বন্ধে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী জুম্ম সমিতির সন্তোশিস চাকমা বলেন, ‘চুক্তির পর ২৫টির বেশি গণহত্যা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে জুম্ম জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যটনের নামে ভূমিহারা হচ্ছে জুম্মরা। ভারতে পালিয়ে যাওয়াদের ফিরিয়ে আনতে সরকারকে আরও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।’
রাঙামাটি সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি পরেশ মজুমদার বলেন, ‘চুক্তির পর চাঁদার কারণে আমাদের অনেক চালক নিখোঁজ হয়েছেন। স্বজনরা এখনও নিখোঁজদের অপেক্ষায় আছেন। অবৈধ অস্ত্রের কারণে পাহাড়ি-বাঙালি সবাই কষ্টে আছি। প্রতি বছর অস্ত্রের ভয়ে চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছি। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হলে পাহাড়ে শান্তি বিরাজ করবে।’