মিয়ানমারের উপকূলে রোহিঙ্গাবাহী দুটি নৌকাডুবির ঘটনায় ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। নিহতদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে বাংলাদেশের শরণার্থীশিবির থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করা রোহিঙ্গারাও ছিলেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানায় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।
এরই মধ্যে টেকনাফ উপকূলে তিনটি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা জানিয়েছেন, আরও একাধিক লাশ ভাসতে দেখেছেন তারা। যদিও উদ্ধার ও ভাসতে দেখা লাশগুলোর সঙ্গে মিয়ানমার উপকূলে নৌকাডুবির ঘটনার কোনও সম্পর্ক এখনও নিশ্চিত করেনি স্থানীয় প্রশাসন।
সাগরে ভাসমান লাশের বর্ণনা
গত ১১ জুলাই বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনের কয়েকজন জেলে গভীর সাগরে একাধিক নারীর ভাসমান লাশ দেখতে পান বলে দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, লাশগুলো দেখে আতঙ্কিত হয়ে তারা জাল গুটিয়ে দ্রুত অন্যদিকে চলে যান।
শাহপরীর দ্বীপের ট্রলার মাঝি আবু বকর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কয়েকদিন আগে মাছ ধরতে গিয়ে জাল তোলার সময় দূরে বেশ কয়েকজন নারীর ভাসমান লাশ দেখতে পাই। দৃশ্যটি দেখে ভয় পেয়ে দ্রুত ট্রলার অন্যদিকে নিয়ে যাই। তখন সাগরে প্রবল বাতাস ছিল। আমার ধারণা, লাশগুলো রোহিঙ্গাদের হতে পারে।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান শাহপরীর দ্বীপের আরেক জেলে সৈয়দ আলম মাঝি। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত সপ্তাহে মাছ ধরা শেষে ফেরার পথে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে সাগরে দুটি শিশুসহ চার লাশ ভাসতে দেখি। তখনই মনে হয়েছিল এগুলো মালয়েশিয়াগামী কোনও ট্রলারডুবিতে মৃত্যু হয়েছে।’
৩ লাশ উদ্ধার
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত কয়েক দিনে টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন উপকূলসংলগ্ন এলাকা থেকে তিনটি অর্ধগলিত নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশগুলোর কোনোটির হাত, আবার কোনোটির মাথা ছিল না। মিয়ানমার উপকূলে রোহিঙ্গাবাহী ট্রলারডুবির খবর গণমাধ্যমে দেখেছি। উদ্ধার হওয়া লাশগুলোর পরিচয় এবং নাফ নদী ও সাগরে ভাসমান লাশের বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। এখনও তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।’
ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতাদের দাবি
রোহিঙ্গা নেতাদের অভিযোগ, রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও চাপ অব্যাহত রয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন। এ সময় জনপ্রতি বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে।
উখিয়ার রোহিঙ্গা নেতা ড. জোবাইর বলেন, ‘রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণভাবে বিতাড়িত করার চেষ্টা চলছে। নানা প্রলোভন দেখিয়ে বর্ষাকালে তাদের সমুদ্রপথে পাঠানো হচ্ছে, যা অনেকের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। নৌকাডুবিতে আমাদের ক্যাম্পের রোহিঙ্গারাও ছিলেন বলে জানতে পেরেছি। তবে স্বজন হারানোর ভয়ে অনেকে এখনও প্রকাশ্যে কথা বলছেন না।’
এখনও নিখোঁজ শতাধিক
এর আগে গত ১১ এপ্রিল আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে গভীর সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় এক নারীসহ নয় জনকে জীবিত উদ্ধার করে ভারতীয় কোস্টগার্ড। সেই ঘটনার পর টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনরা তাদের খোঁজে মরিয়া হয়ে ওঠেন। স্থানীয়দের দাবি, ওই সময়ের ট্রলারডুবির ঘটনায় এখনও শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
এদিকে জাতিসংঘের সর্বশেষ আশঙ্কা এবং টেকনাফ উপকূলে একের পর লাশে উদ্ধারের ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া লাশগুলো মিয়ানমার উপকূলে ডুবে যাওয়া নৌকার যাত্রীদের কিনা, সে বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।