চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ রূপ, জুলাইয়ে আক্রান্ত-মৃত্যুর রেকর্ড, কারণ কী 

চট্টগ্রামে চলতি বছরের মধ্যে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে গত জুলাই মাসে। বছরের সাত মাসে জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৩৪ জন। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৫৩৬ জন, যা মোট আক্রান্তের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। একই সঙ্গে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া তিন জনের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে জুলাই মাসেই। দেখে যে কারও চোখ কপালে ওঠার মতো। যেন এক মাসে সুনামি বয়ে গেছে। ফলে নগর ও বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে জুন মাস পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পর জুলাই মাসে হঠাৎ করেই সংক্রমণ বেড়ে যায়। এক মাসেই সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং চিকিৎসা নিয়েছেন।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছেন ৮৩৪ জন। এর মধ্যে জুলাই মাসে ভর্তি হয়েছেন ৫৩৬ জন। এ ছাড়াও বাকি ছয় মাসের মধ্যে জুন মাসে ১২২ জন, মে মাসে ৩৭ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মার্চে ২০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন এবং জানুয়ারিতে ৬৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। ডেঙ্গুতে চলতি বছর তিন জন মারা গেছেন। এর মধ্যে একজন মারা গেছেন ফেব্রুয়ারি মাসে। বাকি দুজন মারা গেছেন জুলাই মাসে।

আক্রান্তদের মধ্যে চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দা ৩৩৮ জন, উপজেলার বাসিন্দা ৩৪১ জন এবং অন্যান্য জেলার বাসিন্দা ১৫৫ জন। উপজেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সীতাকুণ্ডে ৮৩ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ আক্রান্ত হয়েছেন ৪৮০ জন, নারী ২১৬ জন এবং শিশু ১৩৮ জন।

শনিবার বিকালে জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যে গত জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এডিশ মশার কামড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। তাই ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে মশা থেকে দূরে থাকতে হবে। মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার করার জন্য সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১০৩ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।’

মশা নিধন কর্মসূচি জোরদার হচ্ছে না

নগরের পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ সংগীত আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মুনতাসির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মশার উপদ্রব বাড়লেও মশা নিধন কর্মসূচিতে জোরদার করা হচ্ছে না। আমাদের এলাকায় বিকালের পর মশার যন্ত্রণায় বাসায় টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। মশার কয়েল দিয়েও তাড়ানো যাচ্ছে না। সিটি করপোরেশনের লোকজনকে মশার ওষুধ প্রয়োগ করতে মাসে একবারও দেখা যাচ্ছে না।’

একই অভিযোগ নগরের বহদ্দারহাট ফরিদাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুকের। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফরিদাপাড়া, শমসের পাড়া এলাকায় খোলা বিল, ময়লা-আবর্জনার ডাস্টবিন ও মেডিক্যাল থাকায় মশার উপদ্রবও বেশি। তবে মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের লোকজনকে তেমন দেখা যায় না।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের জরিপে নগরের আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু রোগের উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। জরিপে এসব ওয়ার্ডে এডিস মশার উপস্থিতি বেশি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওয়ার্ডগুলো হলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ২ নম্বর আলকরণ, ৩ নম্বর পাহাড়তলী, ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া, ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ও ৩৯ নম্বর দক্ষিণ বালুচরা।

কী করছে সিটি করপোরেশন

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্ষা শুরুর আগে থেকেই আমরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসজেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। যা বর্তমানে চলমান আছে। নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে মশক নিধনের জন্য সকালে লার্ভিসাইড ও বিকালে ফগিং বা অ্যাডাল্টিসাইড ছিটানোর কাজ ত্বরান্বিত করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগের চিহ্নিত হটস্পটগুলোতে এডিস মশার বিস্তার রোধে পরিত্যক্ত ও নির্মাণাধীন ভবনগুলোকে টার্গেট করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ ছাড়াও হটস্পটগুলাতে মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে ৬০ জনের জনবল নিয়ে টিম গঠন করা হয়েছে।’