থামেনি অনুপ্রবেশ: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩১০ হত্যা, উদ্বেগে স্থানীয়রা

৮৬ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল জব্বারের জীবনের গল্প যেন রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী বেদনার প্রতিচ্ছবি। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুর টুডেং (জব্বারপাড়া) গ্রামের এই প্রবীণ শিক্ষক একসময় মানুষ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। কিন্তু নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া, পরিচয়পত্র পরিবর্তন এবং জান্তা বাহিনীর নিপীড়ন তাকে বারবার জন্মভূমি ছাড়তে বাধ্য করেছে।

১৯৭৮ সালে প্রাণ বাঁচাতে প্রথমবার মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন আব্দুল জব্বার। পরে ১৯৯২ সালে প্রত্যাবাসনের সময় মিয়ানমারে ফিরে যান। কিন্তু নিজ দেশে ফিরে স্থায়ী নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি তার। নানা প্রতিকূলতায় ২০০৪ সালে আবারও মিয়ানমার ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর আশ্রয় নেন কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরে। সেখানেই কেটে গেছে দীর্ঘ ২২ বছর।

সোমবার লেদা রোহিঙ্গা শিবিরে কথা হলে মাস্টার আব্দুল জব্বার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমি আর কোনও প্রতিশ্রুতি নয়, জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ চাই। একবার প্রত্যাবাসনের পর আবারও দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার অভিজ্ঞতা আমাকে এখনও তাড়িয়ে বেড়ায়। বছরের পর বছর প্রত্যাবাসনের আশ্বাস শুনে অপেক্ষা করছি, কিন্তু কবে ফিরতে পারবো, তা এখনও জানি না।’

ক্যাম্পের একটি ঝুপড়ি ঘরেই এখন তার দিন কাটছে। দীর্ঘ বন্দিজীবনের অবসান ঘটিয়ে শেষ বয়সে নিজের মাটিতে ফিরতে চান এই প্রবীণ শিক্ষক। কিন্তু বছরের পর বছর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে থাকায় তার অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে। মাস্টার জব্বারের প্রশ্ন, ‘আমাদের নিয়ে কি বিশ্ব নাটক করছে?’ 

তার এই প্রশ্নেই যেন ফুটে ওঠে কয়েক দশক ধরে ঝুলে থাকা রোহিঙ্গা সংকটের নির্মম বাস্তবতা—ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন আছে, প্রত্যাবাসনের আশ্বাস আছে; কিন্তু নেই ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা।

আমাদের নিয়ে রাজনীতি-বাণিজ্য চলছে

টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদীর ওপারে রাখাইন রাজ্যের মংডুর মেরুল্ল্যা গ্রাম থেকে ২০১৭ সালে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন মুহাম্মদ নুর। বর্তমানে টেকনাফের শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করছেন।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ব আমাদের নিয়ে আলোচনা করে, বৈঠক করে; কিন্তু ঘরে ফেরার পথ খুলে দেয় না। আমাদের নিয়ে রাজনীতি-বাণিজ্য চলছে। যে যার মতো করে আমাদের নিয়ে খেলছে। ৯ বছর ক্যাম্পে পার হয়ে গেছে—কী যে কষ্টের সময় পার করছি, শুধু সেটি আমরা জানি। আমরা এখন নিরাপদে নিজ দেশে ফিরতে চাই।’

বছরের পর বছর কেটে গেলেও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হয়নি। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার মুখে লাখো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার ৯ বছর হতে চললেও প্রত্যাবাসনে কার্যকর অগ্রগতি নেই। বরং অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও নতুন করে অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে। এর মধ্যেই ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২৫ আগস্ট ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার দাবিতে উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে সমাবেশ হওয়ার কথা।

রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের ভাষ্য, নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে তারা মিয়ানমারে ফিরতে চান না। তবে দীর্ঘদিন সীমাবদ্ধ জীবনে বসবাস করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। খাদ্য সহায়তা কমে আসা, কর্মসংস্থানের অভাব, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তাদের জীবনে নতুন সংকট তৈরি করেছে।

২০১৭ সালে যারা শিশু ছিল, তাদের অনেকে এখন তরুণ। আবার ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া হাজারো শিশু কখনোই তাদের জন্মভূমি মিয়ানমার দেখেনি। একটি পুরো প্রজন্ম শরণার্থী পরিচয়ে বেড়ে উঠছে, যার ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।

অন্যদিকে আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বাড়ছে অসন্তোষ। উখিয়া ও টেকনাফের বাসিন্দারা বলছেন, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতি, শ্রমবাজার, পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। সীমিত সম্পদের এলাকায় জনসংখ্যার চাপ বাড়ায় স্থানীয়দের জীবন-জীবিকাও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফলে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে দূরত্বও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

থামেনি অনুপ্রবেশ, বাড়ছে কক্সবাজারের চাপ

৯ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে নতুন করে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত নতুন করে আগত ও নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১ লাখ ৫২ হাজার ২৯। এর মধ্যে শুধু মে মাসেই নতুন করে নিবন্ধিত হয়েছেন ২ হাজার ২৬০ জন। মার্চে নতুন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৬৯ জন। গত ১৫ জুন প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় ইউএনএইচসিআর। এ ছাড়া ক্যাম্পগুলোতে মোট ১১ লাখ ৯৭ হাজার ৪১১ জন রোহিঙ্গাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এক রোহিঙ্গা যুবক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাখাইন রাজ্য বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের তারা শ্রমিক হিসেবে জোরপূর্বক কাজ করাচ্ছে। কেউ রাজি না হলে নির্যাতন চালায়। এ কারণে অনেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে।’

টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রহমান ওরফে ইবনে আমিন বলেন, ‘নতুন আসা রোহিঙ্গাদের ৯ বছর হতে চলছে—কিন্তু এখনও একজন রোহিঙ্গাও প্রত্যাবাসন হয়নি। বরং সীমান্তে অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়নি। এতে স্থানীয়রা নিজেদের অস্তিত্ব, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জীবন-জীবিকা নিয়ে কষ্টের মধ্যে আছেন।’

৯ বছরে ৩১০ হত্যা, মামলায় আসামি ১০ হাজারের বেশি

গত ৯ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩১০ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় ২৮৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার জনকে। এ ছাড়া মাদক, অস্ত্র, দস্যুতা, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে সাড়ে চার হাজারের বেশি মামলায় ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে আসামি করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মাদক সংক্রান্ত সাড়ে তিন হাজার মামলায় আসামি করা হয়েছে ৫ হাজার ৯৭৫ জনকে। অস্ত্র ও দস্যুতার ১৭৫ মামলায় আসামি ৩২০ জন। ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ৩৬২ মামলায় আসামি ৫৭১ জন। অপহরণের ৩২০ মামলায় আসামি ৩৭২ জন এবং মানবপাচারের সাড়ে চার শতাধিক মামলায় আসামি করা হয়েছে ৯৭৯ জনকে। এ ছাড়া অন্যান্য আইনে আরও শতাধিক মামলা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের এমন অপরাধ চিত্র দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আধিপত্য বিস্তার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্ব নিয়েও উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা।

তৈরি হচ্ছে ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া এক প্রজন্ম

২০১৭ সালে শিশু হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের অনেকেই এখন তরুণ। আর ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া হাজারো শিশু কখনো দেখেনি তাদের জন্মভূমি মিয়ানমার। এভাবেই একটি পুরো প্রজন্ম শরণার্থী পরিচয়ে বেড়ে উঠছে, যাদের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।

ক্যাম্প-৮-এর বাসিন্দা মো. আলম বলেন, ‘চার সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলাম। আজ তারা কিশোর বয়সে পা দিয়েছে। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ কী, তা আমরা জানি না। বেকারত্বের কারণে অনেক তরুণ অপরাধের দিকে ঝুঁকছে। আর ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশুদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত—তাদের যেন কোনও ঠিকানাই নেই।’

তিনি বলেন, বছরখানেক শান্ত থাকার পর আবারও হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় ক্যাম্পে আতঙ্ক বেড়েছে। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়া অপরাধীদের অনেকে ফের সক্রিয় হওয়ায় পুরোনো দ্বন্দ্বও মাথাচাড়া দিচ্ছে।

সৈয়দ আলমের দাবি, বর্তমানে ক্যাম্পে পাঁচ থেকে ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়। ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ, মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ সহিংসতার আশঙ্কা আছে।

রোহিঙ্গা এআরএসপিএইচ-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা, কিন্তু মিয়ানমার আমাদের বাঙালি বলে। পুরো দুনিয়া বাংলাদেশ আর মিয়ানমারকে নিয়ে মেতে আছে, কিন্তু সমস্যার কোনও সমাধান হচ্ছে না। এখনও সেখানে খেলা চলছে, যাতে আমাদের যাওয়ার কোনও জায়গা না থাকে।’

আন্তর্জাতিক সমাধানের প্রয়োজন

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার নয়; এটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যাবাসনের রূপরেখা প্রণয়নসহ সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে যাচ্ছে।’

গবেষক ও বিশ্লেষক (অব.) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার বলেন, ‘পরিবর্তিত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশের নীতিতেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন জরুরি। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সীমান্তের বিপরীতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণে থাকা পক্ষগুলোর সঙ্গেও প্রয়োজনীয় যোগাযোগের পথ রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করে বাংলাদেশের ভূখণ্ড বা রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কোনও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার ঘাঁটি হতে দেওয়া যাবে না। প্রত্যাবাসন শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকা ও জমির অধিকার নিশ্চিত করেই তা টেকসই করতে হবে।’

বায়েজিদ সরোয়ার আরও বলেন, ‘এক্ষেত্রে চীন, ভারত, আসিয়ান ও জাতিসংঘকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। পররাষ্ট্রনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা মূল্যায়ন, মানবিক নীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতির সমন্বয়ে বাংলাদেশের একটি দীর্ঘমেয়াদি রাখাইন-রোহিঙ্গা সীমান্ত বিষয়ক কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।

সব মিলিয়ে, রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর পূর্ণ হলেও সমাধানের পথ এখনও অনিশ্চিত। একদিকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় লাখো রোহিঙ্গা, অন্যদিকে নতুন অনুপ্রবেশ, ক্যাম্পের অপরাধ ও অস্থিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠী। ফলে মানবিক সংকটের পাশাপাশি এটি এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত ও আঞ্চলিক কূটনীতিরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।