৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যায়নি, ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস

আবদুল আজিজ, কক্সবাজার
২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩০আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩০

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর নিধনযজ্ঞের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্ণ হলো। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের নানা প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগের পরও এই দীর্ঘ সময়ে একজন রোহিঙ্গাকেও নিরাপদে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। বরং রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাত তীব্র হওয়ায় গত দেড়-দুই বছরে নতুন করে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

ফলে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দীর্ঘদিন প্রত্যাবাসন ঝুলে থাকায় ক্যাম্পে বাড়ছে হতাশা, অপরাধ, মাদক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা। পাশাপাশি খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের সংকট ও নিরাপত্তাহীনতা রোহিঙ্গাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতিতে চাপ বাড়ছে স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও।

ক্যাম্পে ১২ লাখের বেশি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্তমানে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এ ছাড়া ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পে রয়েছে ৩৩ হাজার ৮১৯ জন। সব মিলিয়ে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার তথ্যমতে, রাখাইনে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির চলমান সংঘাতের কারণে নতুন অনুপ্রবেশকারীসহ অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে সাড়ে সাত থেকে ১০ লাখ রোহিঙ্গা সমুদ্র ও স্থলপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বনাঞ্চলে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘ এই দমন-পীড়নকে জাতিগত নিধনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বলে বর্ণনা করেছিল। এর আগে ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালেও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের ঘটনা ঘটে। তবে ২০১৭ সালের ঢল ছিল সবচেয়ে বড় ও দ্রুততম।

নয় বছরে বদলায়নি রোহিঙ্গাদের জীবন

নয় বছর পরও রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রায় তেমন ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বাঁশ ও ত্রিপলের ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস, সীমিত কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়া এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা।

আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার আগের চেয়েও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পে অপরাধ, মাদক ও মানবপাচারের ঝুঁকিও বাড়ছে।

রাখাইনের সংঘাতে নতুন করে অনুপ্রবেশ

২০২৪ সাল থেকে রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাত তীব্র হওয়ার পর নতুন করে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ ছাড়িয়েছে। অনেকে অনানুষ্ঠানিক ও গোপন পথে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছেন। নতুন করে এই অনুপ্রবেশে আগে থেকেই জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে চাপ আরও বেড়েছে।

নতুন করে আসা এক রোহিঙ্গা যুবক বলেন, রাখাইন বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের শ্রমিক হিসেবে জোর করে কাজ করানো হচ্ছে। কেউ রাজি না হলে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এ কারণে অনেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন।

ক্যাম্পে বাড়ছে অস্ত্র, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ

দীর্ঘ নয় বছরে ক্যাম্পগুলোতে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদক চোরাচালানকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আরসা ও আরএসওসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে সাধারণ রোহিঙ্গারা যেমন আতঙ্কে থাকেন, তেমনি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন ত্রাণকর্মীরাও।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে তিন শতাধিক রোহিঙ্গা খুন হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই হত্যা, মাদক, অপহরণ ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অভিযোগে আড়াই শতাধিক মামলা হয়েছে। ক্যাম্প এলাকা থেকে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের মতো মাদক, বিদেশি রাইফেল এবং ওয়ান শুটারগানের মতো দেশি অস্ত্রও উদ্ধার হচ্ছে।

কমছে তহবিল, কমছে খাদ্য সহায়তাও

আন্তর্জাতিক অনুদান কমে যাওয়ায় জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) রোহিঙ্গাদের মাথাপিছু মাসিক খাদ্য বরাদ্দ সাড়ে ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ৬ ডলারে নামিয়ে আনে। শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, বরাদ্দ আরও কমলে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ও মাতৃমৃত্যুর হার বাড়তে পারে।

২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও তার শতাধিক অংশীদার সংস্থা যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (জেআরপি) আওতায় প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সহায়তাও রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। নতুন করে বরাদ্দ কমে গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

প্রত্যাবাসনে প্রতিশ্রুতি অনেক, অগ্রগতি নেই

গত নয় বছরে একাধিকবার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও পাইলট তালিকা তৈরি হলেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়নি। ২০২৫ সালের মার্চে কক্সবাজার সফরে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও দেড় বছর পরও তার বাস্তবায়ন হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাখাইনে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত না হলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।

৩ লাখ ৯ হাজারের তালিকায় আশা, নাকি নতুন অনিশ্চয়তা?

বাংলাদেশ কয়েক দফায় মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে পাঠায়। মিয়ানমার জানিয়েছে, এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। যাচাই হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি এবং ৪ হাজার ২৪১ জনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করেছে মিয়ানমার। তবে যাচাইয়ের পরও প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা হয়নি। বরং মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কাউকে ফেরত নেওয়া হবে না। ফলে যাচাই করা তালিকাও আপাতত কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে।

শুধু তালিকা দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ বদলাবে না

ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যেও প্রত্যাবাসন নিয়ে হতাশা বাড়ছে। তাদের প্রধান দাবি—মিয়ানমারের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং নিজ গ্রাম ও ভিটায় ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ‘আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর সভাপতি মোহাম্মদ জুবাইর বলেন, “অনেকবার শুনেছি তালিকা হয়েছে, যাচাই হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ নিরাপদে নিজের গ্রামে ফিরতে পারেনি। শুধু তালিকা দিয়ে আমাদের আশা বাড়িয়ে আবার হতাশ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের দেওয়া প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা হাস্যকর ও নাটক। তাহলে এখানে ক্যাম্পে থাকা বাকিরা কারা। তারাও তো মিয়ানমারের নাগরিক। এখন আমাদের অস্বীকার করা হচ্ছে।” 

উখিয়ার কুতুপালং ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নূর বেগম বলেন, “আমার পরিবারের নাম তালিকায় আছে কি না, সেটাও নিশ্চিত নই। নাম থাকলেও যদি ফেরার তারিখ না থাকে, তাহলে এই তালিকার মূল্য আমাদের কাছে খুব কম। আমরা মর্যাদা নিয়ে নিজের দেশে ফিরতে চাই, এর আগে নয়।”

উখিয়ার বালুখালী ২ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ সালাম বলেন, “নয় বছর ধরে আমরা অপেক্ষা করছি। এখন ৩ লাখ ৯ হাজার মানুষের তালিকার কথা শুনছি। কিন্তু রাখাইনে নিরাপত্তা না থাকলে কাগজের তালিকা দিয়ে তো জীবন বদলাবে না।”

আন্তর্জাতিক চাপ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি

রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ওপর অর্থবহ চাপ তৈরির পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, সরকার রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে।

অনুষ্ঠানে মানবাধিকারকর্মীরা মানবিক সহায়তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কমাতে রোহিঙ্গাদের মানসম্মত শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থার প্রতিনিধিরা বলেন, তহবিল কমে আসা এবং বৈশ্বিক মনোযোগ অন্য সংকটের দিকে সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় নতুন ও সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন।

স্থানীয়দের ওপরও বাড়ছে চাপ

দীর্ঘ নয় বছরে কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও শ্রমবাজারে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির প্রভাব ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

খাদ্য সহায়তা আরও সীমিত হলে শিবিরের বাইরে স্থানীয়দের জীবিকার উৎসে রোহিঙ্গাদের প্রবেশের প্রবণতা বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সংকট সমাধানে সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগের তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “সন্ধ্যার পর গোলাগুলি ও অপহরণের আশঙ্কায় অনেকে ঘর থেকে বের হতে চান না। ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই দোকান বন্ধ করে ফেলেন। মাদক ও মানবপাচারের নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে পরিস্থিতি কক্সবাজারের সার্বিক আইনশৃঙ্খলার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।”

উজাড় হয়েছে বন, বাড়ছে পরিবেশগত ঝুঁকি

গত নয় বছরে উখিয়া-টেকনাফে বসতি নির্মাণ ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের কারণে প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাহাড় কেটে ও গাছ সাফ করে গড়ে তোলা হয়েছে একের পর এক শিবির। এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন টেকনাফ উপদ্বীপের উপকূল, সেন্ট মার্টিন ও সোনাদিয়া দ্বীপের প্রতিবেশও হুমকির মুখে রয়েছে। এ ছাড়া ক্যাম্পের বর্জ্যে স্থানীয়দের প্রায় ৩০০ একর কৃষিজমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন এনভায়রনমেন্ট মুভমেন্টের টেকনাফ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন বলেন, “দীর্ঘমেয়াদে এ সংকট শুধু মানবিক নয়, এটি পরিবেশ, নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করছে। উখিয়া ও টেকনাফের বনাঞ্চলের বড় অংশ উজাড় হয়েছে। ক্যাম্প নির্মাণ, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলার ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।”

প্রত্যাবাসন যত দীর্ঘ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান বলেন, “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যত দীর্ঘ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপহরণ, মাদক পাচার, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, মানবপাচার এবং ক্যাম্পভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় উদ্বেগ বাড়ছে। এসব অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।”

কক্সবাজারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি, কারণ যেখান থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।”

তিনি বলেন, নতুন তালিকা যাচাই প্রক্রিয়ার একটি অংশ। তবে মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হলে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় দ্রুত টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সামনের পথ কী?

নয় বছর পরও প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকরা বলছেন, রাখাইনে স্থিতিশীলতা ফেরানো, মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখা এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ—এই তিনটি পথ একসঙ্গে এগোতে হবে। ততদিন কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ বাড়ানো এবং ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদার করাই জরুরি।

নয় বছরে বাংলাদেশ প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। প্রত্যাবাসনের জন্য লাখ লাখ মানুষের তালিকা প্রস্তুত হলেও বাস্তবে একজনও নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। ফলে রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক সংকট নয়; বাংলাদেশের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হয়েছে।

 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
থামেনি অনুপ্রবেশ: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩১০ হত্যা, উদ্বেগে স্থানীয়রা
রোহিঙ্গা সংকট: স্মরণ নয়, এবার দায় নেওয়ার সময়
প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান: প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা 
সর্বশেষ খবর
শহুরে কোলাহল ছেড়ে সুইডেনের বনের মাঝে অফ-গ্রিড ছুটি
শহুরে কোলাহল ছেড়ে সুইডেনের বনের মাঝে অফ-গ্রিড ছুটি
থামেনি অনুপ্রবেশ: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩১০ হত্যা, উদ্বেগে স্থানীয়রা
থামেনি অনুপ্রবেশ: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩১০ হত্যা, উদ্বেগে স্থানীয়রা
২ লাখ আশ্রয়প্রার্থীর ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের
২ লাখ আশ্রয়প্রার্থীর ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের
২৩ বছর পর আবারও একসঙ্গে কেট-ম্যাথিউ, ফিরছে ‘হাউ টু লুজ আ গাই’!
২৩ বছর পর আবারও একসঙ্গে কেট-ম্যাথিউ, ফিরছে ‘হাউ টু লুজ আ গাই’!
সর্বাধিক পঠিত
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো’
‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো’
‘পরের বছর থেকে হবে না শর্তে ২৮ আগস্ট হচ্ছে নৌকাবাইচ’
‘পরের বছর থেকে হবে না শর্তে ২৮ আগস্ট হচ্ছে নৌকাবাইচ’
৪০ লাখের বেশি ইভি ফেরত নেওয়ার নির্দেশ
৪০ লাখের বেশি ইভি ফেরত নেওয়ার নির্দেশ