চট্টগ্রাম কলেজের এত সুনাম কেন?

দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে জ্ঞান ছড়িয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম কলেজ। ১৮৬৯ সালে কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরুর পর দীর্ঘ ১৫৭ বছরে প্রতিষ্ঠানটি শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। জ্ঞানচর্চা, মেধার বিকাশ, ভালো ফলাফল এবং দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত কৃতী সাবেক শিক্ষার্থীদের কারণে চট্টগ্রাম কলেজের রয়েছে আলাদা সুনাম।

বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন এই কলেজে। তাদের পাঠদানের জন্য অনুমোদিত শিক্ষকের পদ রয়েছে ১৫৭টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৩৩ জন। অর্থাৎ ২৪টি শিক্ষক পদ শূন্য রেখেই চলছে পাঠদান। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষ ও আবাসিক সুবিধার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

জেলা স্কুল থেকে কলেজ

চট্টগ্রাম কলেজের ইতিহাসের শিকড় আরও পুরোনো। ১৮৩৬ সালের ২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ ৩৩ বছর পর ১৮৬৯ সালে এটি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের কলেজে উন্নীত হয়। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে উচ্চশিক্ষার পরিসর।

১৯০৯ সাল থেকে এ কলেজে কলা বিভাগের পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়। ১৯১০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণির ডিগ্রি কলেজের স্বীকৃতি লাভ করে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষার ইতিহাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম কলেজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল সম্পৃক্ততা।

প্রায় ৬ একরের ঐতিহ্যের ক্যাম্পাস

চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকায় প্রায় ৬ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত চট্টগ্রাম কলেজের ক্যাম্পাস। এখানে রয়েছে ১৬টি প্রাতিষ্ঠানিক ও পাঁচটি আবাসিক ভবন। পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ভবনের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে আধুনিক অ্যাকাডেমিক ভবন ও বিভিন্ন অবকাঠামো। পুরোনো স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন ‘লাল ভবন’ এখনও কলেজের ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।

ক্যাম্পাসে রয়েছে প্রশাসনিক ভবন, রেড বিল্ডিং, অ্যাকাডেমিক ভবন-১, ভূগোল ভবন, উদ্ভিদবিজ্ঞান ভবন, রসায়ন ও প্রাণিবিজ্ঞান ভবন, পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত ভবন, অডিটরিয়াম ভবন, ছাত্রী মিলনায়তন ভবন, টিএসসি ভবন, কেন্দ্রীয় মসজিদ ভবন, মেডিক্যাল সেন্টার, কলেজ ক্রীড়া ভবন, লাইব্রেরি ভবন, অ্যাকাডেমিক ভবন-২ ও অ্যাকাডেমিক ভবন-৩।

আবাসিক ভবনের মধ্যে রয়েছে তিনটি ছাত্রাবাস ও একটি ছাত্রীনিবাস। এগুলো হলো—শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাস, শের-এ-বাংলা ছাত্রাবাস, ড. আব্দুস সবুর ছাত্রাবাস এবং হজরত খাদিজাতুল কোবরা (রহ.) ছাত্রীনিবাস। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাসের দুটি ব্লকের মধ্যে এ ব্লক মুসলিম এবং বি ব্লক অমুসলিম ছাত্রদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে।

১৮ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণা

শিক্ষার্থী সংখ্যার দিক থেকেও চট্টগ্রাম কলেজ দেশের বড় সরকারি কলেজগুলোর একটি। উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। প্রতিবছর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এ কলেজে ভর্তির সুযোগ পেতে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তুলনামূলক কম ব্যয়ে মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগও শিক্ষার্থীদের কাছে কলেজটির আকর্ষণ বাড়িয়েছে।

দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে

১৭ বিষয়ে অনার্স, ১৯ বিষয়ে মাস্টার্স

চট্টগ্রাম কলেজে বর্তমানে ১৭টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্সসহ মোট ২১টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, দর্শন, আরবি ও ইসলামিক শিক্ষা, পালি, সংস্কৃত, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, পরিসংখ্যান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং ভূগোল ও পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ব্যবহারিক ক্লাস ও ল্যাবভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম। মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্যও রয়েছে বিভাগীয় পাঠাগার, সেমিনার ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের সুযোগ। কলেজের পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা অর্ধলাখের বেশি।

১৫৭ শিক্ষকের মধ্যে কর্মরত ১৩৩

প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদানের জন্য চট্টগ্রাম কলেজে শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৫৭টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৩৩ জন। ফলে ২৪টি পদ শূন্য রেখেই চলছে শ্রেণি কার্যক্রম। উচ্চমাধ্যমিক থেকে শুরু করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিভাগভিত্তিক রুটিন অনুযায়ী শ্রেণি কার্যক্রম, ব্যবহারিক ক্লাস, ইনকোর্স পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা ও চূড়ান্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠদান চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পরিচালিত হয়। আর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষা কার্যক্রম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

কলেজ কর্তৃপক্ষ নিয়মিত শ্রেণির রুটিন, পরীক্ষার সময়সূচি, ফরম পূরণ, ফলাফল, আসনবিন্যাস ও বিভিন্ন প্রশাসনিক নির্দেশনা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করছে।

ফলাফলও ভালো

চট্টগ্রাম কলেজ দীর্ঘদিন ধরে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিতভাবে কলেজটির নাম উঠে আসে।

শিক্ষাবোর্ড সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় ১ হাজার ৩০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন ১ হাজার ৪ জন। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৭৭৫ জন। ২০২৪ সালে ১ হাজার ২৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হন ১ হাজার ১৯ জন। উচ্চশিক্ষা পর্যায়েও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করে আসছেন।

পাঠদানে আধুনিকতার ছোঁয়া

একসময় যেখানে শ্রেণিকক্ষ ও বই ছিল শিক্ষার প্রধান মাধ্যম, এখন সেখানে অনলাইন রিসোর্স, ডিজিটাল কনটেন্ট, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস, অনলাইন ফরম পূরণ ও ডিজিটাল যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম কলেজও ধীরে ধীরে এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে।

কলেজের ওয়েবসাইটে নিয়মিত নোটিশ প্রকাশ, অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনা এরই অংশ। 

দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত কৃতী সাবেক শিক্ষার্থীদের কারণে চট্টগ্রাম কলেজের রয়েছে আলাদা সুনাম

কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কলেজে ৩০টি সমৃদ্ধ ল্যাব রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বিশাল পাঠাগার ও বিপুলসংখ্যক বই। তার মতে, এমন সুবিধা খুব কম সংখ্যক কলেজেই রয়েছে।’

যা বলছেন অধ্যক্ষ

চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী কলেজটির সুনাম ও ভালো ফলাফলের বিষয়ে বলেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্যে এ কলেজ স্বনামধন্য। এখানে মূলত মেধাবী শিক্ষার্থীরাই পড়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন। শিক্ষকরাও যত্নসহকারে পাঠদান করেন। এর সঙ্গে আছে অভিভাবকদের প্রচেষ্টাও। যে কারণে চট্টগ্রাম কলেজ ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল করছে।’

আবাসন সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এ কলেজে শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে এ কলেজে চারটি হোস্টেল রয়েছে। যেখানে ৪০০ ছাত্র এবং ২০০ ছাত্রী থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ এ কলেজে ১৮ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। যার প্রায় অর্ধেক ছাত্রী। যে কারণে শিক্ষার্থীর তুলনায় হোস্টেল সুবিধা অত্যন্ত নগণ্য। আরও হোস্টেল হওয়া প্রয়োজন।’

দেড় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখা চট্টগ্রাম কলেজ তাই একদিকে যেমন ঐতিহ্যের ধারক, অন্যদিকে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও আবাসন সুবিধার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারলে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সামঞ্জস্য আরও দৃঢ় হবে।