শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯১৮ সালে। মাত্র ২৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া যে প্রতিষ্ঠান, সময়ের পরিক্রমায় সেটিই আজ পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
একসময় বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার তেমন সুযোগ ছিল না। মাধ্যমিক শেষ করার পর আর্থিক ও যোগাযোগসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতেন। সেই বাস্তবতায় ফরিদপুরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই উদ্যোগের সফল পরিণতিই আজকের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ।
অম্বিকাচরণের উদ্যোগে যাত্রা
বরেণ্য আইনজীবী ও সমাজসেবক অম্বিকাচরণ মজুমদারের উদ্যোগ ও অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯১৮ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে রাজেন্দ্র কলেজের যাত্রা শুরু হয়। ১০ জুলাই মাত্র ২৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে কলা বিভাগের পাঠদান দিয়ে যাত্রা হলেও ধীরে ধীরে কলেজটির শিক্ষার পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯২১ সালে আইএসসি ও ডিগ্রি (পাস) কোর্স চালু হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয়। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি (পাস), স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
যে ইতিহাসের পথ ধরে
রাজেন্দ্র কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনের ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯১২ সালে গভর্নর লর্ড কারমাইকেল ফরিদপুরে এলে তার কাছে শহরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা হয়। পরে কলেজ প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব নেন জেলার বিশিষ্ট আইনজীবী ও প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা অম্বিকাচরণ মজুমদার।
১৯১৫ সালের ১৫ নভেম্বর ফরিদপুরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সভা করেন অম্বিকাচরণ মজুমদার। তার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার কাজ ছিল ফরিদপুর শহরে দ্বিতীয় গ্রেডের একটি কলেজ স্থাপনের রূপরেখা তৈরি করা। কমিটি অল্প সময়ের মধ্যেই শহরের পূর্বপাশে, বর্তমান শহর ক্যাম্পাস এলাকায় খেলার মাঠ ও মেলা ভবনের আংশিক পরিবর্তন করে কলেজ ভবন তৈরির পরিকল্পনা দেয়।
কলেজ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য ৮০ হাজার টাকার প্রাথমিক তহবিল গঠনের সুপারিশ করা হয়। ১৯১৬ সালের ৯ জানুয়ারি অম্বিকাচরণ মজুমদারকে সভাপতি করে কলেজ কমিটি গঠিত হয়। ব্যবসায়ীসহ শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে কমিটি।
এরপর আর্থিক সহায়তার জন্য ফরিদপুর জেলার বাইশরশির জমিদার রমেশ চন্দ্র রায় চৌধুরীর কাছে প্রস্তাব নিয়ে যান অম্বিকাচরণ মজুমদার। রমেশ চন্দ্র রায় চৌধুরী তার প্রয়াত বাবা রাজেন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরীর নামে কলেজের নামকরণের শর্তে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন। ১৩ আগস্টের সভায় কলেজ কমিটি সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়ে কলেজের নাম ‘রাজেন্দ্র কলেজ’ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
এরপর অম্বিকাচরণ মজুমদার কলেজের জন্য খেলার মাঠ ও মেলা ভবন এলাকার ৫ দশমিক ২০ একর খাসজমি বরাদ্দের জন্য সরকারের কাছে এবং কলেজের অধিভুক্তির জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আবেদন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা অনুমোদন করে।
পরবর্তী সময়ে কলেজের আর্থিক ভিত্তি, শিক্ষার্থীদের আবাসিক ব্যবস্থা ও শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক কামাখ্যা নাথ মিত্রকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
১৯১৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পৌর চেয়ারম্যান মথুরা নাথ মিত্র তার ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে মেলা ভবন কলেজ কমিটির কাছে এক হাজার টাকায় বিক্রি করে দলিল সম্পাদন করেন। একই সময়ে বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে বার্ষিক মাত্র এক টাকা খাজনার বিনিময়ে মেলার মাঠে ৫ দশমিক ২০ একর জমি কলেজকে মঞ্জুর করা হয়। পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারত সরকারের অনুমোদন পেয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজেন্দ্র কলেজ।
২৯ থেকে ২৫ হাজার
সরকারি কলেজের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজেন্দ্র কলেজে ২১টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। ১৯টি বিষয়ে অনার্স এবং ১৫টি বিষয়ে মাস্টার্স পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। একসময় ২৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা কলেজটিতে এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। কলেজটির আয়তন ৫৪ দশমিক ১০ একর। রয়েছে দুটি ক্যাম্পাস, প্রশাসনিক ভবন, একাধিক অ্যাকাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাস।
শহর ক্যাম্পাসে প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি (পাস) পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অন্যদিকে বায়তুল আমান ক্যাম্পাসে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর কারণে দুই ক্যাম্পাসের একাধিক ভবনে বিভিন্ন পর্যায়ের পাঠদান পরিচালিত হচ্ছে।
পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষা
শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীদের বহুমুখী বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ক্রীড়া, সংস্কৃতি, বিতর্ক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ রয়েছে।
কলেজে বিএনসিসির দুটি কন্টিনজেন্ট, রোভার স্কাউটের তিনটি গ্রুপ এবং রেড ক্রিসেন্টের একটি ইউনিট রয়েছে। আছে চারটি খেলার মাঠ ও দুটি মুক্তমঞ্চ। এসব সহশিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক দক্ষতা অর্জনে ভূমিকা রাখছে।
শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে কলেজে রয়েছে দুটি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও ২১টি বিভাগীয় লাইব্রেরি। এসব লাইব্রেরিতে প্রায় ৫০ হাজার বই রয়েছে।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এস এম আবদুল হালিম জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক পদের সংখ্যা ১৭৯টি। বর্তমানে ১৬৫ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে লাইব্রেরিগুলোর পাশাপাশি চারটি খেলার মাঠ, মুক্তমঞ্চ, কমন রুম, মসজিদ, মন্দির ও বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধেরও সাক্ষী
রাজেন্দ্র কলেজের ঐতিহ্য শুধু এর বয়স কিংবা শিক্ষা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সময়ে এ প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষা, প্রশাসন, রাজনীতি, আইন, চিকিৎসা, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন পেশায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও কলেজটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলেজ প্রাঙ্গণে পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। পরে সেখানে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পও স্থাপিত হয়। ফলে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও সাক্ষী হয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফরিদপুরের গণ্ডি পেরিয়ে আশপাশের প্রায় ১০ জেলার শিক্ষার্থীদের কাছেও সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিষ্ঠার সময় যেখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করাই ছিল মূল লক্ষ্য, এক শতাব্দী পর সেই প্রতিষ্ঠানই হাজার হাজার শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
বদলায়নি শিক্ষার আলো ছড়ানোর লক্ষ্য
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক ও প্রবীণ সাংবাদিক প্রবীর কান্তি বালা ওরফে পান্না বালা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে অম্বিকাচরণ মজুমদারের উদ্যোগে যে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালানো হয়েছিল, তা আজ বিশাল এক জ্ঞানভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। ২৯ জন শিক্ষার্থী দিয়ে শুরু হওয়া সেই প্রতিষ্ঠান আজ প্রায় ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর।’
তিনি বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে ক্যাম্পাস, বেড়েছে বিভাগ ও শিক্ষার পরিধি, তবে বদলায়নি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মূল লক্ষ্য। ঐতিহ্য, শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও বহুমুখী কার্যক্রমের সমন্বয়ে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ তাই আজও ফরিদপুর তথা দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাতিঘর।’
ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয়
এক শতাব্দীর পথ পেরিয়ে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ এখন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞান, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, সহশিক্ষা কার্যক্রম ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। কলেজের নিজস্ব তথ্যেও মানসম্পন্ন শিক্ষা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, পরীক্ষার ফলাফল এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশকে প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধ্যক্ষ প্রফেসর এস এম আবদুল হালিমের নেতৃত্বে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের সমন্বয়ে শতবর্ষের ঐতিহ্য ধরে রেখে আধুনিক শিক্ষার চাহিদা পূরণের চেষ্টা চলছে এই প্রতিষ্ঠানে। ২৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর বিশাল শিক্ষাঙ্গনে পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে প্রতিষ্ঠান, কিন্তু শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যটি রয়ে গেছে একই।









