ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ ৫ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে, বদলিই কি একমাত্র শাস্তি?

মেঘনা উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে সরকারি অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি দফতরের প্রধানকে ঘিরে এক মাসে ঘটেছে একের পর এক প্রশাসনিক রদবদল। ঘুষ গ্রহণ, টেন্ডারবাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কাউকে সাময়িক বরখাস্ত, কাউকে স্ট্যান্ড রিলিজ এবং কাউকে বদলি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ দফতরগুলোর প্রধানদের এমন ধারাবাহিক বিদায়ে জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রশাসনিক শূন্যতা ও স্থবিরতার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে তাদের বদলির বিষয়টিকে সঠিক বলছে সচেতন মহল। সেইসঙ্গে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে বদলিই কি একমাত্র শাস্তি, এমন প্রশ্নও তুলেছেন তারা। 

বাংলাদেশের সরকারি চাকরি আইন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন এবং প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী দুর্নীতির জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি কঠোর আইনি শাস্তির বিধান রয়েছে। অনেক সময় প্রাথমিক পদক্ষেপ বা তদন্তের স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি বা স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়, যা চূড়ান্ত শাস্তি নয়।

সচেতন মহলের লোকজন বলছেন, আমাদের দেশে প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম, দুর্নীতি বা অবহেলার ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়—অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কেবল বদলি করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়। সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: তাহলে মূল বিচার বা ব্যবস্থা নেবে কে? আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী, বদলি কোনও শাস্তি নয়, এটি কেবল একটি সাময়িক প্রশাসনিক পদক্ষেপ। 

গত দুই মাসে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেন লক্ষ্মীপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিন। বকেয়া বিল ও মালামালসংক্রান্ত ফাইল অনুমোদনের বিনিময়ে এক ঠিকাদারের কাছে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ-সংক্রান্ত কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘২ কোটি টাকার নিচে নেবো না!’

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে পিডিবি। ঘটনাটি তদন্তে গঠন করা হয়েছে উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি।

এদিকে লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কার ও ড্রেন নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এতে ক্ষুব্ধ হন স্থানীয় বাসিন্দারা। সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জুলফিকার হোসেনকে তলব করে। পরিস্থিতির মধ্যে তাকে জরুরি ভিত্তিতে খাগড়াছড়িতে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়।

অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আক্তারের বিরুদ্ধে ৯ হাজার ৩৮৯টি বিনামূল্যের টুইন পিট ল্যাট্রিন বিতরণ এবং ৫৬ কোটি টাকার ওয়াশ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮ থেকে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণকাজেও অনিয়ম ও তদারকিতে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগের মধ্যে তাকেও লক্ষ্মীপুর ছাড়তে হয়েছে।

মেঘনা উপকূলীয় কমলনগর ও রামগতি উপজেলায় নদীর তীর সংরক্ষণ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজের গতি ও মান নিয়ে শুরু থেকেই অসন্তোষ ছিল। কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ্জামান খানকে বদলি করা হয়। এরপর নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনিস হায়দার খান দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় তাকেও সরিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে দফতরটিতে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. নুরুল ইসলাম।

অনিয়মের অভিযোগে সর্বশেষ আলোচনায় এসেছেন মাধ্যমিক শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের (ইইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী শ্রাবণী চক্রবর্ত্তী। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজে সরকারি দরপত্র নীতিমালা উপেক্ষা করে সিলড কোটেশনের (এসএলডি) মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ ভাগ করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ক্ষুব্ধ ঠিকাদারদের প্রতিবাদ ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে শেষ পর্যন্ত তাকেও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে বদলি করা হয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) লক্ষ্মীপুর সভাপতি মো. কামাল হোসেনসহ স্থানীয় প্রতিনিধিরা মনে করেন, শুধু বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত করাই যথেষ্ট নয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনকালে সম্পন্ন হওয়া প্রতিটি প্রকল্পের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা (অডিট) করা প্রয়োজন। বদলিই কি একমাত্র শাস্তি? আসলেই না। অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।