কুমিল্লা নগরের ধর্মসাগরপাড়ে ভাষাসৈনিক ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক বাসভবন সংরক্ষণ করে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ দাবিতে শুক্রবার (৭ নভেম্বর) রাতে বাড়িটির সামনে স্থাপন করা একটি সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছেন দলটির কুমিল্লা মহানগর শাখার নেতাকর্মীরা। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সাইনবোর্ড ভাঙার ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আরমা দত্ত।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িটি সংস্কার, সংরক্ষণ ও সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন বিভিন্ন মহল। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। সম্প্রতি বাড়িটির সামনে সম্পত্তির মালিকানা দাবি করে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন আরমা দত্ত। তিনি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের একমাত্র ছেলে সঞ্জিব দত্তের মেয়ে এবং পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রে ওই সম্পত্তির ওয়ারিশ বলে দাবি করেছেন।
সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, কুমিল্লা।
এনসিপির নেতাদের দাবি, বাড়িটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। তাদের অভিযোগ, বাড়িটি বিক্রির উদ্যোগ হিসেবে সেখানে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে এবং পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাড়িটি বিক্রি ঠেকাতেই তারা সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এনসিপির নেতাকর্মীরা বাড়িটির সামনে গিয়ে প্রথমে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য দেন। পরে তারা সেখানে স্থাপিত সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন।
এদিকে রাতে এনসিপির কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসারের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়। এটি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাই বাড়িটিকে ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় না করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করার কথাও জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
রাত ১০টার দিকে এনসিপির কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসার বলেন, আমরা একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাব। এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।
এ বিষয়ে আরমা দত্ত বলেন, এটা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। এটা কুমিল্লাবাসীও জানে। তাই এ বাড়িটির জায়গা আমি কী করব, রাখব না বিক্রি করবো, এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করবো।
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড কে ভেঙেছে, সে বিষয়ে এখনও কেউ তাকে অবহিত করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে ও তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাদের আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। দিলীপ কুমার দত্তের মেয়ে আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।