শীতে কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলে পানি কমতে শুরু করলেও ইজারাদারদের ভয়ে কৃষকরা নিজেদের জমিতে যেতে পারছে না। ধীরে ধীরে হাওরে ডুবে থাকা জমিগুলো ভেসে উঠছে। বীজতলা তৈরির আগে কৃষকদের মাছ ধরার পালা। কিন্তু মাছ ধরা তো দূরের কথা, ইজারাদারদের ভয়ে তারা জাল নিয়ে নিজ জমির কাছেও যেতে পারছেন না। ইজারাদারদের কারণে নিজ জমি থেকে খাওয়ার জন্য দুটো মাছ ধরবে, সে উপায়ও নেই বলে জানান কৃষকরা।
গত এপ্রিলের মাঝামাঝি জেলার নিকলী, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রামসহ ৯টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ১ লাখ ৩৮ হাজার ৯২ জন কৃষকের বোরো ধানের জমি বন্যায় তলিয়ে যায়। ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় তারা বন্যা পরবর্তী সময় হাওরের জলাশয় থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে চেয়েছিল। তাই জেলে ও কৃষকরা জীবিকা নির্বাহের তাগিদে প্রশাসনের কাছে জলাশয়গুলো উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু সে ধরনের কোনও ব্যবস্থা না হওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা।
নিকলী উপজেলার দামপাড়া ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামের মইচ উদ্দিন, ফেরদৌস আহম্মেদ ও মো. তাফসির বলেন, আমাদের বাড়ির পাশে চাকিডর নলুয়া চকচকিয়া নামে একটি বিল আছে। সরকারিভাবে ওই বিল ৬ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু এসব ইজারাদাররা বিলের সাথে আমাদের জমিও দখল করে রাখে। তাদের ক্ষমতার কাছে আমরা জিম্মি হয়ে গেছি। এ নিয়ে যখনই প্রতিবাদ করতে যাই বা নিজ জমিতে মাছ ধরতে যাই তখনই মারধর করতে আসে। ইজারাদাররা সাধারণ জেলে ও কৃষকদের জমি বছরের পর বছর দখল করে রেখে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অবৈধভাবে আমাদের হাজার হাজার একর জমি ভোগ করছে।
ভুক্তভোগী আরেক কৃষক মিজানুর রহমান কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমাদের প্রায় ১৫ একর জমি তারা দখল করে রেখেছে। দখলকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় আমার ভাই অর্তকিত হামলার শিকার হয়েছে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি এখন কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আমরা ভুক্তভোগী কৃষক ও জেলেরা প্রশাসনের নিকট এসব সমস্যার দ্রুত সমাধানের দাবি জানাচ্ছি।
অন্যদিকে স্থানীয় ইজারাদার মতিউর রহমান জানান, ‘তাদের সরকারিভাবে যতটুকু জমি ইজারা দেওয়া হয় তারা শুধু তাতেই মাছ চাষ করেন। প্রতিবছর ইজারা বাবদ তারা সরকারি কোষাগারে লাখ লাখ টাকা জমা দিয়ে থাকেন। হাওরের পানি বেড়ে গেলে সেই মাছ আশপাশের শত শত একর জমিতে ছড়িয়ে পরে। তখন ওই মাছ অন্যদের ধরতে দিলে তারা বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই তারা ওইসব জমির মালিকদের মাছ ধরতে বাধা দেন।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার সূত্র মতে, ছোটবড় মিলিয়ে জেলায় জলমহাল রয়েছে ১৯০টি। তবে এর মধ্যে বেশকিছু নদীও রয়েছে এবং সবই ইজারা দেওয়া। কৃষক বা জেলেদের জন্য কিছুই রাখা হয়নি।
জেলা প্রশাসক মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস জানান, হাওরের প্রত্যেকটি জলমহালের একটি সুনির্দিষ্ট তফসিল আছে। যখন পানি বেড়ে যায় তখন ওই সীমানাগুলো চিহ্নিত করা যায় না। তাই যারা এই জলমহালগুলো লিজ বা ইজারা নেয় তাদের ওই সীমানার বাইরে যাওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। তবে তারা যাতে ইজারা নেওয়া জায়গার বাইরে কৃষকের জমি থেকে মাছ ধরতে না পারে সে ব্যাপারে আমরা সজাগ ও সর্তক আছি। ইজারাদাররা যেন কোনও ভাবেই তাদের তফসিলকৃত সীমানার বাইরে গিয়ে মাছ ধরতে না পারে সে ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে স্মার্ট কার্ড ভূমিকা রাখবে: নির্বাচন কমিশনার