২০০ টাকার পুঁতি দিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন ফরিদা

মাত্র ২০০ টাকা দিয়ে ২০১২ সালে প্রথম স্বপ্ন বোনা শুরু করেন ফরিদা পারভিন। এই ২০০ টাকার পুঁতি কিনে তিনি তৈরি করেন মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ। প্রথম ব্যাগটি দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় তা অনেকেরই পছন্দ হয়। আগ্রহ নিয়ে আরও ব্যাগ তৈরি করতে থাকেন। প্রথম দিকে সেই ব্যাগ বিক্রি করতেন পরিচিতদের মাঝে। নিপুনভাবে তৈরি এই ব্যাগের কদর দিন দিন বাড়তে থাকে। চাহিদা বাড়ায় বেশ কিছু মেয়েকে ব্যাগ তৈরির পদ্ধতি শিখিয়ে তাদের কাজে লাগাতে শুরু করেন।

এরপর আস্তে আস্তে ব্লক, অ্যাম্ব্রোয়েডারি, বাটিক, অ্যাপলিকের তৈরি থ্রি পিস, শাড়ি, বিছানার চাদর, কুশন কাভার, গায়ের চাদর, ওড়না, বাচ্চাদের আধুনিক পোশাক, পাথরের তৈরি ব্যাগ, ফ্লুটস আইটেম, গিফট আইটেম তৈরি শুরু করেন। এর মাধ্যমে অনেক কর্মহীন নারীর কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রেখেছে।

চাকরিজীবী বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে বড় হয়ে চাকরি করবেন। কিন্তু তা না হলেও হয়েছেন কুটিরশিল্প উদ্যোক্তা। ২০১৫ সালে টাঙ্গাইল শহরে নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেন ‘ফারজিমস হ্যান্ডিক্রাফ্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে ৮০ জন নারী কর্মরত আছেন। যাদের নিখুঁত হাতের ছোঁয়ায় তৈরি এসব পণ্য স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও ভোলায়।

ফরিদা পারভিন বলেন, ‘প্রথম দিকে বিভিন্ন জায়গায় পণ্যের স্যাম্পল পাঠিয়ে দিতে হত। এখন যারা নিয়মিত কাস্টমার, তাদের চাহিদা দিলে সেই অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা হয়। এছাড়াও দেশে যতোগুলি মেলা হয় তার প্রায় সবগুলিতেই উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করি, সবার মাঝে আমার পণ্যের পরিচিতি ঘটানোর জন্য’।

তিনি বলেন, ‘আমাদের উৎপাদিত পণ্য সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় বাঙালিদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ওইসব দেশ থেকে আত্মীয় স্বজন অথবা পরিচিত কেউ এলেই আমার পণ্যসামগ্রী নিয়ে যায় বিক্রি করার জন্য। সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা পেলে আমাদের পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করে ওইসব দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে রফতানি করে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারবো’।

বর্তমানে সম্পূর্ণ হাতের তৈরি ছেলেদের পাঞ্জাবি, ফতুয়া এবং বিভিন্ন বৈচিত্রময় তাঁতের শাড়িও তৈরি করছেন। শুধু কুটির শিল্পের এসব পণ্য তৈরি করে ক্ষ্যান্ত হননি ফরিদা পারভিন। করেছেন কর্মবিমুখ মানুষদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও। সেখানে অ্যাম্ব্রোয়েডারি, ব্লক, বাটিক, বুটিকস, অ্যাপলিক, স্টোনের তৈরি ব্যাগ, গিফট আইটেম, কাটিং/টেইলারিং, সিনামিক্স, পাটের তৈরি পণ্য ও হরেক রকমের দেশি-বিদেশি, চাইনিজ রান্না শেখানো হয়। এখান থেকে ১৩৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

ফরিদা পারভিন বলেন, ‘আমার মা হাতের কাজে পারদর্শী ছিলেন। তিনিই আমাকে ২০০ টাকার পুঁতি কিনে দিয়েছিলেন। মায়ের অনুপ্রেরণাতেই শুরু করেছিলাম পুঁতি দিয়ে ব্যাগ তৈরির কাজ। আর এখন আমার এই প্রতিষ্ঠানকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আমার স্বামী ও শাশুড়ি সার্বিক সহোযোগিতা করে যাচ্ছেন।’

এইচএসসি পরীক্ষার পর এই হস্ত শিল্প তৈরির কাজ শুরু করেন ফরিদা পারভিন। বর্তমানে তিনি শাহ জালাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে ফার্মেসিতে ডিপ্লোমা করছেন। এসবের মধ্যেই তিনি ২০১৪ সালে মহিলা সংস্থা এবং মহিলা অধিদফতর থেকে আলাদাভাবে প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৫ সালে যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকেও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

তিনি বলেন, আমার এই প্রতিষ্ঠানকে যুগোপযোগী করে তোলার জন্য এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। তাই সরকার যদি সহজ শর্তে এবং অল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করে দিতো তাহলে ব্যবসার প্রসার ঘটাতে পারতাম।

জাতীয় মহিলা সংস্থার টাঙ্গাইল জেলা কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াছমিন বলেন, ফরিদা পারভিনের ব্যবসা শুরুর জন্য আমরা তাকে প্রাথমিকভাবে কিছু টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছিলাম। সে টাকা পরিশোধ হচ্ছে। আর তার এই উদ্যোগকে আরও বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় মহিলা সংস্থা সব রকমের ব্যবস্থা করবে।

এদিকে, জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাসরিন সুলতানা বলেন, অচিরেই তার জন্য মহিলা অধিদফতরের যে সহজ শর্তে ঋণ আছে সে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়ে তার ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সাহায্য করা হবে।

উল্লেখ্য, গত বছর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত মেলায় প্রথম স্থান অধিকার করে ফরিদার স্টল।

 /বিটি/টিএন/

আপ-এসটি