আদালতের নির্দেশ মানছে না খুলনা কাস্টমস, আন্দোলনে মংলা বন্দর ব্যবহারকারীরা

চীন থেকে এলসির মাধ্যমে মংলা বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত ২ হাজার ১০৫টি মনিটর ছাড়করণের নির্দেশ দেন আপিল ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু ওই আদেশ মানছেন না মংলা কাস্টমসের কমিশনার। ফলে মালামাল ছাড়পত্র না দেওয়ায় গুদামে থাকা মনিটরগুলো নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া পোর্ট ডেমারেজও বাড়ছে। এদিকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করায় ক্ষুদ্ধ ব্যবসায়ীরা আন্দোলন শুরু করেছেন।Khulna-Pic-3-(15-11-10)

ধারাবাহিক আন্দোলনে মঙ্গলবার মংলা বন্দর ব্যবহারকারীরা খুলনা মহানগরীর পিকচার প্যালেস মোড়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছে। এ সময় তারা মংলা কাস্টমসের কমিশনার আল আমিন প্রামাণিকের প্রত্যাহার দাবি জানান।

সূত্র জানায়, ঢাকার মেসার্স আর কে ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে চীন থেকে ২ হাজার ১০৫টি মনিটর আমদানি করে। মংলা বন্দরে আসা এসব মনিটর মেসার্স সী ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির মাধ্যমে ছাড়করণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মালামাল খালাসের সময় কায়িক পরীক্ষায় ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য আনার বিষয়টি ধরা পরে। প্যাকিং লিস্ট ও বি/ই এর ঘোষণার সঙ্গে অমিল পাওয়া যায়। ৪নং পণ্যে ২১ ইঞ্চির পরিবর্তে ২২ ইঞ্চি এবং ৫নং পণ্যে ২২ ইঞ্চির পরিবর্তে ২৪ ইঞ্চির অতিরিক্ত পণ্য পাওয়া যায়।

আমদানিকারক আর কে ইন্টারন্যাশনালের মালিক নুর ইসলাম জানান, কাস্টম কমিশনার তার ক্ষমতা অপব্যবহার করে গত ২১ আগস্ট তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমদানিকারকের ওপর ২০ লাখ টাকা এবং ১৫ লাখ টাকা বিমোচনসহ ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা করাসহ মোট ৫৫ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য্য করে এবং প্রচলিত নিয়মের বাইরে অতিমাত্রার মূল্য ভিত্তি নির্ধারণ করে একটি আদেশ দেন। কাস্টমস অ্যাক্ট অনুযায়ী কমিশনার আদেশের বিরুদ্ধে তিনি শুল্কনীতি অনুযায়ী কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন। গত ৩ অক্টোবর আপিলাত ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাকির হোসেন এক আদেশে মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আমদানিকৃত পণ্য চালানের বিপরীতে জরিমানা বাবদ ব্যাংক গ্যারান্টি ও শুল্ককরাদি নগদ ট্রেজারি ৩৫ লাখ টাকা দেওয়ার সাপেক্ষে পণ্য খালাসের জন্য কাস্টম কমিশনার বরাবর আদেশ দেন।

এদিকে রায়ের এ আদেশ পাওয়ার পর গত ১৭ অক্টোবর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ মোতাবেক মংলা কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার পন্য খালাস গ্রহণ করার জন্য ওই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে পত্র (আদেশ নথি নং এস/৩৮৮৮/গ্রুপ-৪/এ্যা/মংলা/১৫-১৬/ ৫৭৫৭(১) দেন। এর একদিন পর ১৮ অক্টোবর কাস্টম কমিশনার আল-আমিন প্রামাণিক একটি পত্র মারফৎ ১৭ অক্টোবরের আদেশটি বাতিল করেন। এরপর কমিশনার আপিলাত ট্রাইব্যুনালের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ মোতাবেক পণ্য খালাসের কার্যক্রম গ্রহণ না করে গত ২৩ অক্টোবর হাইকোর্টে আদেশটির বিরুদ্ধে আপিল করার উদ্দেশ্যে এটর্নি জেনারেল অফিসে চিঠি দেন। গত ২৪ অক্টোবর ডেপুটি এটর্নি জেনারেল হাইকোর্টে আপিলের সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে আপিলাত ট্রাইব্যুনালের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ মোতাবেক পন্য খালাস দেওয়ার কর্যক্রম গ্রহণ করার জন্য কমিশনার পরামর্শ দেন। কিন্তু কমিশনার এখন পর্যন্ত কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ মানছেন না। ডেপুটি এটর্নি জেনারেলের পরামর্শও আমলে না নিয়ে আমদানিকৃত পন্য শুল্কায়ন ও খালাস কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন। যা শুল্কনীতি, রাষ্ট্রীয় আইন ও সংবিধান পরিপন্থী বলে দাবি করেছেন আমদানিকারক নুর ইসলাম।

এদিকে পণ্য খালাসে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের জন্য কাস্টম কমিশনারকে চিঠি দিয়েছেন সী ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি লিমিটেড এবং মংলা কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়াডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে মংলা কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়াডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, নৌ-পরিবহন মালিক গ্রুপ, শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্সসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসায়ী সংগঠন গত ৬ নভেম্বর যৌথ সভা ডেকে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

মংলা কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুলতান হোসেন খান বলেন, কাস্টমের শুল্ক বিভাগের খামখেয়ালিপনা ও দ্বৈত নীতির কারণে মংলা বন্দরের ব্যবসায়ীরা আগের মত আর পণ্য খালাস করছে না। কাস্টমস কমিশনার প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নির্দেশনা মানছে না। সর্বশেষ আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছেন।

মংলা বন্দর ব্যবহারকারী সমন্বয় কমিটির সভাপতি সৈয়দ মোস্তাহেদ আলী বলেন, মংলা শুল্ক ভবনে দৈনন্দিন কাজে বিরাজমান চিহ্নিত সমস্যা হচ্ছে- মংলা কাস্টমস কমিশনার কর্তৃক বিভিন্ন কাজে মংলা বন্দর ব্যবহারকারীদের হয়রানি, মংলা বন্দরে আমদানি পণ্য খালাসে তড়িৎ পদ্ধতি অনুস্মরণ না করে অহেতুক বিলম্ব, হয়রানিতে আমদানীকারকদের আর্থিক ক্ষতি, শুল্ক মূল্যায়ন বিধিমালা ২০০০ এর প্রজ্ঞাপন অনুস্মরণ না করা, চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্য চালান দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে ১০% কায়ীক পরীক্ষা করা হয় অথচ মংলা বন্দরে ১০০% কায়ীক পরীক্ষা করার মাধ্যমে আমদানিকারকদের অর্থের অবচয়, আমদানিকৃত পন্য চালান শুল্কায়নের আগে কায়ীক পরীক্ষা সম্পন্ন করার মাধ্যমে আমদানিকারকদের মংলা বন্দর ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা, দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে ব্যবহারযোগ্য সব পণ্য মংলা বন্দরের মাধ্যমে আমদানি বাধ্যতামূলক না করা।

খুলনা বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ মালিক গ্রুপের মহাসচিব অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কাস্টম কমিশনারের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্ণীতির বিষয়ে এনবিআরের চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করেছি। এক ব্যক্তির কারণে একটি বন্দর ধ্বংস হতে পারে না। তার কারণে এ বন্দরের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কাজী আমিনুল হক বলেন, ব্যবসায়ীদের সমস্যা নিয়ে কয়েকবার কাস্টম অফিসে গিয়েছি কিন্তু কমিশনার ব্যবসায়ীদের কথা শোনেন না, ব্যবসায়ীদের কথার গুরুত্ব দেন না। এই কমিশনার এত পরিমাণ জরিমানা করে যে ব্যবসায়ীর পূঁজি বাঁচানো দায় হয়ে পড়েছে।

সংসদ সদস্য আলহাজ মিজানুর রহমান মিজান বলেন, আমরা খুলনাবাসী সব সময়ই বঞ্চিত। আমরা কোনও না কোনওভাবে কেবলই পিছিয়ে যাচ্ছি। কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তার কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সমস্যার ব্যাপারে শনিবার কাস্টম কমিশনারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তিনি আমার ফোন ধরেননি।

তিনি বলেন, যারা এ বন্দরটি ধ্বংস করে দিতে চায় তারাই ষড়যন্ত্র করছে। আর সেই দিকেই এগোচ্ছে বলে আমার ধারণা।

মংলা কাস্টম কমিশনার আল-আমিন প্রমাণিক বলেন, সব পণ্যে অতিরিক্ত শুল্কায়ন নেওয়া হয় না।

তিনি আরও বলেন, অনৈতিক দাবিগুলোকে প্রশ্রয় না দেওয়ার কারণে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা সাধারণ ব্যবসায়ীদের রাজপথে নামিয়েছে। যা উচিত নয়।

/এআর/