১৯৭১ এর কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ জমাদ্দার এখন ‘শহিদ মাইক সার্ভিস’ নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে জীবন চালাচ্ছেন। নীরবে-নিভৃতে কেটে গেছে তার ৬৪ বছর।
শহিদ জমাদ্দার পাঁচ (তিন মেয়ে, দু’ছেলে) সন্তানের জনক। বসবাস করছেন খুলনা মহানগরীর নিরালা প্রান্তিকা মসজিদ সংলগ্ন কাশেম নগরে। শহিদ হাদিস পার্ক সংলগ্ন স্থানে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি ‘শহিদ মাইক সার্ভিস।’ তিনি এখন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের রূপসা উপজেলা শাখার সহকারী কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মুক্তিযোদ্ধা শহিদ জমাদ্দার খুলনার রূপসা উপজেলার ২নং শ্রীফলতলা ইউনিয়নের নন্দনপুর গ্রামের মৃত রফি উদ্দিন জমাদ্দারের ছেলে। পাঁচ ভাই-বোনের (দু’ভাই, তিন বোন) মধ্যে পঞ্চম। তার বড় ভাই হারুনার রশিদ জমাদ্দার জেলা মুজিব বাহিনীর গ্রুপ কমান্ডার ছিল। বর্তমানে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা।
যুদ্ধকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করে অত্যাচার-নির্যাতনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে শহিদ জমাদ্দার জানান, ১৯৭১ এ বাড়ি ছেড়ে তেরখাদার পাতলা স্কুলে চালু হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে যান। সেখানে গিয়ে ক্যাপ্টেন ফহম উদ্দিন, বোরহান উদ্দিন মাস্টার, তৎকালীন তেরখাদা থানার ওসি নিরঞ্জন কুমার এবং তৎকালীন কোদলা ইউপি চেয়ারম্যান নওশের আলীর নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ নেন। একদিন মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর লিখিত ‘খুলনা এ্যাটাক’র একটি চিঠি অপর মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ হোসেনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। নওশের চেয়ারম্যান কারও নাম উল্লেখ না করে জেলখানা ঘাটে সাদা ও গোলাপী কালারের শার্ট-প্যান্ট পরা একজনকে খামটি পৌঁছে দিতে বলেন। খামটি দেওয়ার পর তার কাছে পাল্টা আরও একটি খাম দিলে সেটি পাতলা ক্যাম্পে নিয়ে যেতে বলেন। তিনি খাম নিয়ে নৌকায় করে বর্তমান বঙ্গবন্ধু কলেজের সামনে গেলে পাকিস্তানী বাহিনী তাকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে আটক করে। পরে ট্রেনিং ক্যাম্প নিয়ে সহযোগীদের নাম জানতে চায়। নাম না বলায় সিগারেট এবং চুলার জলন্ত কাঠ দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাকা দেওয়া হয়। নির্যাতনের সময় হিন্দিতে তারা বলে, ‘তেরা ফৌজ কাহা, ছাচ বাতা, ছৌড় দেইলে’ (তোদের লোকজন কোথায়, সত্যি কথা বল, ছেড়ে দেব)।
এক পর্যায়ে পাকিস্তানী নৌবাহিনীর লঞ্চে থাকা স্থানীয় আলাউদ্দিন লস্করের ছেলে রাজাকার ল ম লিয়াকত লস্করকে (পরবর্তীতে এরশাদ শিকদারের সহযোগি) খোঁজ নিতে শহিদ জমাদ্দারের বাড়িতে পাঠানো হয়। তখন তার চাচাতো ভাই সিদ্দিক আহমেদ জমাদ্দার এবং তার ছেলে নজরুল জমাদ্দার জানায়, ‘শহীদরা দুই ভাই মুক্তিযোদ্ধা।’ পরবর্তীতে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অনুরোধ করলেও পাকিস্তানি নৌবাহিনী তাকে ছাড়েনি। তাকে বর্তমান খালিশপুর নেভি ক্যাম্পে নিয়ে ৬ দিন আটকে রাখা হয়। একই সঙ্গে নৌ কমান্ডার আসলাম উদ্দিন খানসহ অন্যরা বর্বর নির্যাতন চালায়। একদিন পর বেলা ১১টায় তাকে গুলি করা হবে বলে আগের দিন জানানো হয়। সে মোতাবেক তাকে নৌবাহিনীর মেজরের অফিসে নেওয়া হয়। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান খালিশপুর চরেরহাটের ঠিকাদার (পাক-নৌ বাহিনীর খাদ্য সরবরাহকারী) আব্দুর রউফ শেখ বসা। ওই সময় রউফ শেখের অনুরোধে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি জোড়াগেট মোড়ে আসার পর দু’জন সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে দেখা হয়। তিনি বাড়ি যাওয়ার পথে চাচাতো ভাই নজরুলের সঙ্গে দেখা হলে তাকে রাজাকার দিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। তিনি বাড়িতে গিয়ে খবরটি মাকে বলে প্রতিবেশী আউয়ুব শেখ ও রশিদ সরদারকে নিয়ে পাতলা ক্যাম্পে ফিরে যান। ক্যাম্পে তাদের ট্রেনিংএর ব্যবস্থা করেন। সেখানে আলাইপুর, বাতিখালকুলি এবং পোলেরহাটে যুদ্ধ করেন। তখন মুক্তিযোদ্ধারা স্থানীয় বেলফুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্যাম্পে অবস্থান করতেন। এভাবে অস্ত্র হাতে তিনটি যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছেন শহীদ জমাদ্দার।
শহীদ জমাদ্দার বলেন, প্রথমে সম্মানি হিসেবে তিনি ৩শ’ টাকা ভাতা পেতেন। বর্তমানে ১০ হাজার টাকা হয়েছে। কিন্তু পরিবার-পরিজনের খরচ এবং সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য তা পর্যাপ্ত নয়।
/জেবি/
আরও পড়তে পারেন: অ্যাপসেই পাওয়া যাবে রাবি সংশ্লিষ্টদের কন্টাক্ট নম্বর