যশোরে বর্ষবরণ প্রস্তুতি: ২৩ বছর পর সম্মিলিত মঙ্গল শোভাযাত্রা

Jessore 1424 pic 1

নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্ণময় এবং আকর্ষণীয় করতে চারুপীঠসহ যশোরের বিভিন্ন সংগঠন তৈরি করছে বিশাল আকারের ময়ূর, নৌকা, নানা আকারের পুতুল, কচ্ছপ, রঙিন ছাতাসহ আরও কত কী! নতুন বছরকে বরণ করে নিতে  নানা ধরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। ২৩ বছর পর আবারও যশোরে সম্মিলিতভাবে পালন করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা।

বর্ষবরণ শেষে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট উদযাপন করবে দুই দিনব্যাপী ‘নববর্ষ উৎসব’। বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি উদযাপনের পাশাপশি সংবর্ধিত করা হবে সেইসব কীর্তিমানকে, যারা মেধা, মনন ও শ্রম দিয়ে বাঙালির এই উৎসবকে বিশ্বদরবারে সম্মানিত করেছেন।

চারুপীঠ যশেরের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘শোভাযাত্রাকে বর্ণিল ও আকর্ষণীয় করতে আমরা করেছি বিশাল আকৃতির ময়ূর, পুতুল, লোকজ নৌকা, হাতি, ঘোড়া, কচ্ছপ, ফড়িং, ইঁদুর। তৈরি হচ্ছে নানা প্রকারের মুখোশ, মুকুট, ছাতা।সব সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে ২০ জন করে প্রতিনিধি আকর্ষণীয় সাজে শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন। কে কী সাজবেন তা নিজেরাই নির্ধারণ করবেন।’

Jessore 1424 pic 5

যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান বলেন, ‘এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় সব সাংস্কৃতিক সংগঠন, আর্ট ইনস্টিটিউট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে। থাকবে সাধারণ মানুষও। একটা জমজমাট শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।’

তিনি আরও  জানান, মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল কাজ করছেন চারুপীঠ শিল্পীরা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও থাকছে কিছু পস্তুতি। পহেলা বৈশাখ সকাল সাড়ে ৮টায় কালেক্টরেট চত্ত্বর থেকে শোভাযাত্রা শুরু হবে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের জেলা সভাপতি ডিএম শাহিদুজ্জামান বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অনন্য সংগঠন চারুপীঠ যশোরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাহবুব জামাল শামীম, হিরন্ময় চন্দ্র প্রমুখ। প্রথম বছরে খুব একটা মানুষ এতে অংশ না নিলেও মঙ্গল শোভাযাত্রাটি মানুষের হৃদয়ে যে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়,তারই ধারাবাহিকতায় পরের বছর থেকে যশোরবাসী সম্মিলিতভাবে এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। আস্তে আস্তে এটা ঢাকাসহ দেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।’

ডিএম শাহিদুজ্জামান বলেন, ‘নানা কারণে আমরা বাংলা ১৪০০ (১৯৯৩) সালের পর আর সম্মিলিতভাবে এই উৎসবে অংশ নিতে পারিনি। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর কেউ কেউ মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজক হিসেবে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউকে সামনে আনার চেষ্টা করছে। সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করতে না পারলে এই বিকৃতি রোধ করা যাবে না।’

Jessore 1424 pic 2

জোট সভাপতি আরও জানান, মঙ্গল শোভাযাত্রা ছাড়াও যশোরের ২২টি সাংস্কৃতিক সংগঠন যৌথভাবে ৪ ও ৫ বৈশাখ (১৭ ও ১৮ এপ্রিল) টাউন হল ময়দানে নববর্ষ উৎসব করবে। এখানে সংবর্ধনা জানানো হবে মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তাদের।

চারুপীঠ যশোরের অধ্যক্ষ, মঙ্গল শোভাযাত্রার জনক মাহবুব জামাল শামীম বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের জীবনকে শিল্পবিবর্জিত, গুণহীন, জড়তা, বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে প্রাণখোলা-গুণী-রসিক-শিল্পীত জাতি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ নিয়ে ১৩৯২ বঙ্গাব্দে (১৯৮৫ সাল) যশোর শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রার রূপায়ণ ও প্রচলন করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় সব সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিকে। এটি শিল্পের একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়। যাতে আবহমান বাংলার নৃত্য ও বাদ্যসহ দৃশ্যমান শিল্পের আঙ্গিক ও লোক ঐতিহ্যের মোটিভ খোজা শুরু হয়, শুরু হয় শেকড়ের সন্ধানে যাত্রা।’

শামীম বলেন, ‘আমি, শিল্পী হিরন্ময় চন্দ এবং চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু করি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্ট কলেজ মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে। বর্তমানে পশ্চিমবাংলাসহ যেখানেই বাঙালি বাস করে, সেখানেই এ উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। ১৩৯৬ বঙ্গাব্দ (১৯৮৯ সাল) থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ অতি আন্তরিকতায় সঙ্গে এ উৎসবকে ধারণ ও বিকাশের দায়িত্ব নেয়। এখন পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালির প্রাণের দাবি হয়ে উঠেছে, স্বীকৃতি পেয়েছে ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের।’

সমগ্র জাতিকে অনুপ্রাণিত ও পথ প্রদর্শনের জন্য যশোরে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়েছিল,২০১৬ সালে সেই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। বাংলা নববর্ষ সমাগত। ঐতিহ্যের উৎসমূলে সেই স্বীকৃতিকে বর্ণালি উৎসবে রূপ দিতে যে আয়োজন চলছে,তার উচ্ছ্বাস দেখা যাবে পহেলা বৈশাখের সকালে-এমনটাই আশা  উদ্যোক্তাদের।

/জেবি/

আরও পড়তে পারেন: জামিন পেলেন মেয়র মিরুর ভাই পিন্টু