বাগেরহাটে ‘চরমপন্থী’ আতঙ্কে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা

হুমকি‘চরমপন্থী’ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বাগেরহাটে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। নিষিদ্ধ ঘোষিত দল পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ) পরিচয়ে দফায় দফায় মোবাইল ফোন করে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে তাদের কাছে। ইতোমধ্যে এক কর্মকর্তার কাছ থেকে একাধিক বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টি সিভিল সার্জন অফিসের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছে। তবে এসব নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে মনে করছে পুলিশ।

বাগেরহাট সিভিল সার্জন অফিসের স্টেনোগ্রাফার শেখ নাসির উদ্দিন জানান, গত ৬ আগস্ট অফিসের টেলিফোনে একটি কল আসে। ফোনটি রিসিভ করতেই অপরপ্রান্ত থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব মো. মাহবুবুল আলম বীর বিক্রম পরিচয় দিয়ে সিভিল সার্জন কোথায় জানতে চান। স্যার বাইরে আছেন জানালে, প্রথমে সিভিল সার্জন এবং একের পর এক কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোন নম্বর নিতে থাকেন যুগ্মসচিব পরিচয় দানকারী ওই ব্যক্তি।

এক পর্যায়ে নাসির উদ্দিনের সন্দেহ হলে আর কোনও নম্বর এই মুহূর্তে তার কাছে নেই বলে জানান। এতে অপরপ্রান্ত থেকে ‘নম্বর কেন নেই’ বলে হুমকি দেওয়া হয়। নম্বর ম্যানেজ করে টেলিফোনে বা ইমেইলে দিচ্ছি জানালে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘তার টেলিফোন ও ইমেইলে অন্য কাজ চলছে।’ পরে নাসির উদ্দিনের ব্যক্তিগত নম্বরটি চান সর্বহারা পরিচয়দানকারী।

নাসির উদ্দিন অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শে মন্ত্রণালয়ে ফোন করে জানতে পারেন মো. মাহবুবুল আলম বীর বিক্রম নামে কোনও যুগ্মসচিব নেই।

মঙ্গলবার (৮ আগস্ট) বিকালে বাগেরহাট সদর হাসপাতালের সিনিয়র মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ( ল্যাব:) এস এম নজরুল ইসলামের কাছে ফোন করে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পাটির (এমএল-জনযুদ্ধ) সদস্য পরিচয় দিয়ে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করা হয়। বিষয়টি কাউকে জানালে বা এই মুহূর্তে টাকা না দিলে এখনই তার স্ত্রীকে হত্যা করা হবে বলে জানানো হয়। এমনকি তার একমাত্র ছেলে ঢাকায় থাকে তাকেও তুলে নেওয়ার হুমকি দেন চরমপন্থী পরিচায়দানকারী। নিরুপায় হয়ে তিনি চারটি নম্বরে বিকাশের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। ভয়ে বুধবার সারা দিন তিনি মোবাইল ফোন বন্ধ রাখলেও অফিসের টেলিফোনে তাকে খোঁজা হয়েছে।

বাগেরহাট সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বুধবার পর্যায়ক্রমে সিভিল সার্জন অফিসের মেডিক্যাল অফিসার ডা. প্রদীপ কুমার বকসী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায়, প্রধান সহকারী শেখ মিজানুর রহমান, হিসাব রক্ষক মো. রেজাউল করিম, স্টোর কিপার শেখ দাউদ আলী, ক্যাশিয়ার নাজনীন আক্তার, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর শেখ কামরুজ্জামান, প্রজেক্টশনিক মো. আবু ইউছুপ, ইপিআই সুপার মো. আব্দুস সোবহান, জেলা পাবলিক হেলথ নার্স হেমলতা সরকার, কোল্ড চেইন টেকনিশিয়ার টিএম ওমর ফারুক, জেলা সেনেটারি ইন্সপেক্টর নীহার রঞ্জন হালদারের কাছে পাঁচ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা চাওয়া হয়েছে।

চরমপন্থী সংগঠন ‘জনযুদ্ধে’র প্রধান দাদা তপন, শিমুল ও হাতকাটা বিল্পব নাম পরিচয় দিয়ে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইল নম্বরে ফোন করা হচ্ছে জনযুদ্ধের পরিচয় দিয়ে। দাবি করা হচ্ছে মোটা অংকের চাঁদা। হুমকি দিয়ে বলা হচ্ছে— ‘ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার পথে বিজিবির সঙ্গে গুলিতে তাদের দলের কয়েকজন সদস্য জখম হয়ে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রচুর পরিমাণ টাকার প্রয়োজন।’ এই হুমকির পর বাগেরহাট সিভিল সার্জন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ‘চরমপন্থী’ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

সিভিল সার্জন অফিসের মেডিক্যাল অফিসার প্রদীপ কুমার বকসী জানান, বুধবার বেল সাড়ে ১১টার দিকে তাকে ফোন করে নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ) পরিচয়ে আহত সদস্যদের চিকিৎসার জন্য ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। আধা ঘণ্টার মধ্যে এই টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এত টাকা নেই জানালে, ফোন যিনি করেছেন তিনি বলেন, ‘তোর জন্য দুই লাখ। আধা ঘণ্টার মধ্যে পাঠাবি।’

এতো টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ফোনকারী বলেন, ‘তুই কত দিবি?’ ২০ হাজার টাকা দিতে চাইলে বলেন, ‘কোনোভাবেই না। দুই লাখ দিতেই হবে তোকে।’

বাগেরহাটে সিভিল সার্জন ডা. অরুন চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘আমার অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে ফোন করে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ) পরিচয় দিয়ে মোটা অংকের চাঁদা চাওয়া হচ্ছে। এতে  কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে একজন ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দিয়েছেন। বিষয়টি বাগেরহাট পুলিশ সুপারকে জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে।’

গত কয়েকদিন চরমপন্থী সংগঠন পরিচয়ে বাগেরহাট বিদুৎ বিভাগ, এলজিইডি, মোল্লাহাট শিক্ষা অফিস, প্রণিসম্পদ বিভাগ এবং কচুয়া শিক্ষা অফিসসহ বিভিন্ন উপজেলার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইলেও ফোন করে হুমকি দিচ্ছে।

এবিষয়ে বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাকে জানানো হয়েছে। এরকম ফোন পেয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সতর্ক থাকতে হবে। বার বার ফোন দিলে বা কোনও সমস্যা হলে পুলিশকে জানাতে হবে। পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।’

/এসএমএ/এফএস/ 

আরও পড়ুন- বাগেরহাটে চরমপন্থী পরিচয়ে চাঁদা দাবি, আতঙ্কে সরকারি কর্মকর্তারা