অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চলাতেন জানারুল। প্রায় বছর দুয়েক আগে বাড়ি থেকে রাগ করে চলে যান গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি উপজেলায়। সেখানে মাঠে সেচমেশিন চালানোর কাজ নেন। কাশিয়ানিতেই পরিচয় হয় জুয়েল নামের রাজশাহীর এক মৌ চাষির সঙ্গে। তার পরামর্শে জানারুল মাস পাঁচেক আগে গ্রামে ফিরে আসেন। জুয়েলের কাছ থেকে কিনে আনেন ৪০ হাজার টাকায় মৌ চাষের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। তারপর হুদাপাড়া মাঠে মৌ চাষ শুরু করেন। গ্রামবাসী প্রথমে তাকে ঠাট্টা-মশকরা করে। এখন তার পোয়াবারো। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার মধু বিক্রি করছেন তিনি। সংসারেও ফিরতে শুরু করেছে সচ্ছলতা।
মা-বাবা, স্ত্রী ও মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস (৭) নিয়ে তার সংসার। দুই বোনের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে।
মৌ চাষি জানারুল বলেন, ‘কাশিয়ানিতে জুয়েল ভাইয়ের মৌ চাষ দেখে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। কিছু টাকা জোগাড় করে বাড়ি ফিরে আসি। পরে ওই জুয়েল ভাইয়ের সঙ্গে রাজশাহী থেকে ৪০ হাজার টাকায় ৭টি বক্স, মৌমাছিসহ ৩৫ টি চাক এবং চাক থেকে মধু ছাড়ানো মেশিন কিনে নিয়ে আসি। পরে আরও একটি বক্স এবং ১০টি চাক বাড়িয়েছি। বর্তমানে মোট ৮টি বক্সে ৪৫টি চাক আছে। ২ মাসে প্রায় ১শ ৩০ কেজির মতো মধু বিক্রি করেছি। প্রতি কেজি ৩শ টাকা করে বিক্রি করি। এলাকায় নির্ভেজাল মধুর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই বাড়ি থেকেই বিক্রি হয়ে যায়। প্রতি সপ্তাহে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা লাভ থাকে।’
বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি মুচকি হেসে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অভাবের তাড়নায় গিয়েছিলাম।’
জানারুল বলেন, ‘একটি বক্সে একটি মাত্র রানি মৌমাছি থাকে, আর পুরুষ মৌমাছি থাকে ৪-৫টি। বাকিরা সবাই শ্রমিক। তারা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকে।’ রানি মৌমাছি না থাকলে চাকে মধু হবে না বলে জানালেন মৌ চাষি জানারুল।
চুয়াডাঙ্গায় এটাই বাণিজ্যিকভাবে প্রথম মৌ চাষ উল্লেখ করে দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি অফিসার সুফি রফিকুজ্জামান বলেন, ‘মৌমাছি ফুলে বসার মধ্যদিয়ে পরাগায়ন হয়। যে মাঠে যত বেশি মৌমাছি থাকবে, সেই মাঠে তত বেশি পরাগায়ন হবে। স্বাভাবিকভাবে একবিঘা জমিতে ৪-৫ মণ সরিষা হয়। মৌমাছি বেশি হলে প্রায় ২৫ ভাগ উৎপাদন বেড়ে যায়। এই মৌসুমে দামুড়হুদা উপজেলায় প্রায় আড়াইশ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে না করে কমিউনিটি আকারে সরিষার আবাদ করাটাই উত্তম। এতে উৎপাদন ভালো হবে এবং মৌ চাষও এগিয়ে নেওয়াটা সহজ হবে।’
সরকারি এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘শুধু সরিষার মৌসুমেই নয়, সারা বছরই মৌ চাষ করা যাবে। কারণ আমাদের দেশে সারা বছরই কোনও না কোন ফুল থাকে। ফলে সরিষা শেষে আম বাগান, লিচু বাগানেও মৌ চাষ করা যাবে। মৌ চাষে বিনিয়োগের তুলনায় মুনাফা বেশি। কেউ যদি বাণিজ্যিকভাবে মৌ চাষ করতে চান, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।’
আরও পড়তে পারেন: