অগ্রহায়ণে নতুন ধান উঠার সঙ্গে গ্রাম-বাংলায় রেওয়াজ আছে পিঠাপুলি খাওয়ার। নতুন ধানের মৌ মৌ সুবাস আর খেজুর রসের মিষ্টি স্বাদে পিঠা-পায়েস অনিবার্য হয়ে পড়ে। এ অবস্থা চলতে থাকে বসন্তের আগমন পর্যন্ত।
চিরাচরিত এই রীতি যে শুধু গ্রামের মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা কিন্তু নয়। শহুরে জীবনেও রয়েছে এর দারুণ প্রভাব। তবে শহুরে মানুষের অনেকে যেতে চান না পিঠাপুলি তৈরির ঝামেলায়। এজন্য ব্যস্ত শহুরে জীবনের মানুষজন তাদের কাছে যান; যারা পিঠাপুলি তৈরি করেন। সন্ধ্যা নামতেই পিঠাপুলির দোকানে ভিড় করেন তারা। কেউ দোকানে বসে আবার কেউ বাসায় নিয়ে খান পিঠাপুলি। এক্ষেত্রে চিতই ও ভাপা পিঠা সবার পছন্দের শীর্ষে। সবার পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে শহরের মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে অনেক পিঠাপুলির দোকান। এমনি একটি দোকান যশোরের ‘মা ও ছেলের পিঠাঘর।’ যেখানে প্রতিদিন আট হাজার টাকার পিঠা বেচাকেনা হয়।
মা ও ছেলের পিঠাঘরে মাঝেমধ্যে পিঠা খেতে আসেন শহরের পালবাড়ি এলাকার বিল্লাল হোসেন ও মুজিবর কাজী। তারা জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে একবার এসেছিলেন। আজ আবার এসেছেন পিঠা খেতে। খাওয়ার পর বাড়ির জন্যও কয়েকটা নিয়ে যান তারা।
শহরের রিকশাচালক রবি দাশ বলেন, ‘১১ বছর ধরে প্রায়ই সন্ধ্যায় এখানে আসি। একটা চিতই ও একটা ভাপা পিঠা খাই। বাসায় এসব পিঠা তৈরি করতে ঝামেলা হয়। তাই মাঝেমধ্যে বাড়ির সদস্যদের জন্য নিয়ে যাই।’
গৃহিণী লায়লা পারভীনের বাসা শহরের লোন অফিস পাড়ায়। ছেলেমেয়ের জন্য ২৭ পিস চিতই পিঠার অর্ডার দিয়েছেন। কিছু পিঠা ভর্তা দিয়ে খাবেন। বাকিগুলো গুড়-দুধে ভিজিয়ে ছেলেমেয়েকে খেতে দেবেন তিনি।
মা ও ছেলের পিঠাঘর
যশোর শহরের অম্বিকা বসু লেন (রাঙ্গামাটি গ্যারেজ) এলাকায় ছোট একটি দোকান নিয়ে মা জহুরুন নেসা (৬০) ও ছেলে আজিজুর রহমান (৩৫) পিঠাপুলি তৈরি করে বিক্রি করছেন। যশোর শহরের অনেকে তাদের চেনেন। কারণ এখানে গত ১৯ বছর ধরে চিতই ও ভাপা পিঠা বিক্রি করছেন তারা।
দুপুর আড়াইটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা
দোকানের বাইরের বেশিরভাগ খোলা। বেড়া ও ছাউনি টিনের। দোকানের ভেতরে এক সারিতে রয়েছে মাটি দিয়ে তৈরি পাঁচটি চুলা। পরপর চারটি চুলায় হচ্ছে চিতই (যশোরের ভাষায় কাঁচিপোড়া) পিঠা। আরেক চুলায় ভাপা পিঠা তৈরি হয়। যা যশোরের ভাষায় ধুপি পিঠা। জহুরুন নেসা চিতই পিঠা আর আজিজুর রহমান বানান ভাপা পিঠা। দুপুর আড়াইটা থেকে শুরু হয়; চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। অনেকে এখানে বসে পিঠা খান। তবে বেশিরভাগ পিঠা যায় পার্সেলে।
শুরুর কথা
প্রায় ২০ বছর আগে মারা যান জহুরুন নেসার স্বামী আশরাফ আলী মোল্যা। দুই ছেলে ও এক মেয়ে তখন বেশ ছোট। তাদের নিয়ে বিপাকে পড়েন জহুরুন নেসা।
শুরুর কথা জানিয়ে জহুরুন নেসা বলেন, ‘সেসময় সন্তানদের নিয়ে পরের বাসায় যে কাজ করবো সে উপায় ছিল না। তখন আমার ভাইয়ের স্ত্রী পরামর্শ দেন, রাস্তার পাশে চুলা দিয়ে পিঠাপুলি বিক্রি করতে। তখন যশোর শহরের বারান্দীপাড়া কদমতলা মোড়ে দুই কেজি চালের গুঁড়া নিয়ে পিঠা তৈরি করে বিক্রি শুরু করি। তারপর থেকেই চলছে। এখন খেয়েপরে ভালোই আছি।’
ছেলে আজিজুর রহমান বলেন, ‘মা প্রথম শুরু করেন দুই থেকে চার কেজি চালের গুঁড়া দিয়ে। এখন প্রতিদিন ৩৫ কেজি চালের গুঁড়ার পিঠা বিক্রি হচ্ছে। নিয়মিত ছয় জন কাজ করছি। এর মধ্যে তিন জন শ্রমিক। তাদের দিনে ৫০০ টাকা মজুরি দিই।’
প্রতিদিন চিতই পিঠার জন্য ২০ কেজির বেশি চালের গুঁড়া আর ১৫ কেজির বেশি সিদ্ধ চালের গুঁড়া লাগে ভাপা পিঠা বানাতে জানিয়ে আজিজুর রহমান বলেন, ‘ভাপা পিঠার জন্য নারকেল ২০ পিস আর খেজুরের পাটালি ১০ কেজি লাগে। চিতই পিঠার সঙ্গে চিংড়ি ভর্তা ও শুকনো ঝালের চাটনি দিই। পাশাপাশি ধনেপাতা, জিরা, কাঁচামরিচ ও সরিষার ভর্তা আছে। এগুলোর জন্য দাম নেওয়া হয় না।’
এক কেজি চালের গুঁড়ায় ভাপা হয় ২০টি, আর স্পেশাল ভাপা ২৫টি। স্পেশাল ভাপার ক্ষেত্রে পাটালি ও নারকেলের কোরা লাগে বেশি। অপরদিকে প্রতি কেজি চালের গুঁড়ায় চিতই পিঠা হয় ১৫ পিস। হিসাবে, প্রতিদিন ভাপা পিঠা ৩০০ পিস আর চিতই পিঠা ৩০০ পিস তৈরি করি। চিতই পিঠার পিস ১০ টাকা, ভাপা ১৫ টাকা এবং স্পেশাল ভাপা ২০ টাকা বিক্রি করি।’
প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টাকার পিঠা বিক্রি হয় জানিয়ে আজিজুর রহমান বলেন, ‘শহরের মানুষ খাটা-খাটুনি করে বাড়িতে পিঠা তৈরির চেয়ে এখান থেকে কিনে নিয়ে রস কিংবা গুড়-দুধে চিতই পিঠা ভিজিয়ে খান। সে কারণে এখান থেকে লোকজন বেশি চিতই পিঠা কিনে নিয়ে যান।’
পিঠা তৈরির রেসিপি
পিঠা তৈরির প্রণালী জানিয়ে আজিজুর রহমান বলেন, ‘চিতই পিঠা তৈরির জন্য যে গুঁড়ি গুলতে হয়, সেখানে পানি-লবণের একটা সুনির্দিষ্ট পরিমাণ লাগে। বেশিরভাগ মানুষ এই গোলা তৈরি করতে পারেন না। সে কারণে ভালো পিঠা হয় না। মায়ের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আছে, এজন্য গোলা ভালোভাবে তৈরি করে দেন, পিঠাও ভালো হয়।’
জহুরুন নেসার বাড়ি যশোরের বাঘারপাড়ায়। বর্তমানে শহরের বারান্দীপাড়া কদমতলা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। পিঠার দোকানের জন্য প্রতিমাসে আড়াই হাজার টাকা আর বিদ্যুৎ বিল ২০০ টাকা দিতে হয়।
ঐতিহ্যের আবহে গ্রামীণ পিঠাপুলি
বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যে পিঠাপুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পিঠা-পায়েস সাধারণত শীতকালের রসনাজাতীয় খাবার হিসেবে পরিচিত। মুখরোচক খাদ্য হিসেবে সমাজে আদরণীয়। আত্মীয়-স্বজন ও পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনকে আরও দৃঢ় ও মজবুত করে তুলতে পিঠাপুলির উৎসবের বিশেষ ভূমিকা আছে। গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে পিঠা-পায়েস তৈরির ধুম পড়ে শীতকালে।
বাংলা ভাষায় লেখা কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অন্নদামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চৈতন্য চরিতামৃত ইত্যাদি কাব্য এবং মৈমনসিংহ গীতিকায় কাজল-রেখা গল্পকথনের সূত্র ধরে আনুমানিক ৫০০ বছর আগেও বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতিতে পিঠার জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ পাওয়া যায়।
কাজেই ধরে নেওয়া যায় পিঠা খাওয়ার প্রচলন বাঙালি সমাজে প্রাচীন। উপমহাদেশে বসবাস করা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পিঠা যে জনপ্রিয় খাবার, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। প্রাচীন বাংলায় মিষ্টান্ন হিসেবে পিঠার জনপ্রিয়তা সম্ভবত বেশি ছিল।
সবচেয়ে জনপ্রিয় পিঠা হচ্ছে ভাপা। এছাড়া আছে চিতই, দুধচিতই, ছিট পিঠা, দুধ পুলি পিঠা, ক্ষীর কুলি, তিলকুলি, পাটিসাপটা, ফুলঝুড়ি, নকশি পিঠা, মালাই পিঠা, মালপোয়া, পাকন পিঠা ও ঝাল পিঠা ইত্যাদি।