সাতক্ষীরায় যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, এক মাসে আক্রান্ত ৩৯১

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন আব্দুস সালাম বলেছেন, ‘ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যক্ষ্মা বেশি হয়।  যক্ষ্মায় বেশি আক্রান্ত হয় গরিব অসহায় শিশু ও কর্মক্ষম নারীরা। দরিদ্র পরিবারের নারীদের বেশি সুষম খাদ্যের অভাব হয়। পরিবারের অন্যদের দিকে খেয়াল করতে গিয়ে তাদের খাওয়া ঠিকমতো হয় না। সেজন্য তারা রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। একজন পুরুষ আক্রান্ত হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও একজন নারী আক্রান্ত হলে তার অবস্থা খারাপ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় না।’

বুধবার (২৭ নভেম্বর) বেলা ১১টায় সিএসসিএস ও সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে সাতক্ষীরা শহরের অদূরে একটি কনফারেন্স রুমে নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে যক্ষ্মা রোগীদের অধিকার, জেন্ডারবৈষম্য দূরীকরণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক যক্ষ্মা পরিষেবা শীর্ষক অ্যাডভোকেসি কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘যক্ষ্মা রোগীর প্রধান লক্ষণ হাঁচি-কাশি। সাধারণত কাশি হলে পল্লিচিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে কিছু দিন ভালো থাকে। কিন্তু যক্ষ্মার জীবাণু থাকলে সে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। যক্ষ্মায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা পরিবারের সদস্য, শিশু, বয়োবৃদ্ধ, বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তারা যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন বেশি।’

সিভিল সার্জন বলেন, ‘অক্টোবর মাসে সাতক্ষীরা জেলায় ৫ হাজার ৪০৭ জনকে পরীক্ষা করে ৩৯১ জন যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। যার অধিকাংশ নারী ও শিশু। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় ৪ হাজার ৮৯৮ জনকে পরীক্ষা করে ৩৬৭ জন যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। সেই হিসেবে জেলায় যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টি আমরা পজেটিভভাবে দেখছি। যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগী লুকিয়ে থাকলে তার দ্বারা আরও অনেক মানুষ আক্রান্ত হবে। পজেটিভ রোগীকে শনাক্ত করতে পারলে রোগী ছড়াতে পারবে না।’

সার্জন আব্দুস সালাম বলেন, যক্ষ্মা রোগ হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব মানলেই যক্ষ্মা থেকে বাঁচা সম্ভব। পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে তাকে দূরে ঠেলে দিলে হবে না। ভালোবাসা দিয়ে নিয়মিত ওষুধ সেবন করালেই যক্ষ্মা রোগীকে দ্রুত সুস্থ করা সম্ভব। সাধারণত ধরা হয়, প্রতি এক লাখ জনগোষ্ঠীর প্রতিবছর কমপক্ষে ২১৮ জন টিবি রোগী পাওয়া যাবে। সেই হিসেবে সাতক্ষীরায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক কম। প্রতিটি কাশির পরীক্ষা করতে সরকারের খরচ হয় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। কিন্তু দেশের সব জায়গায় বিনা মূল্যে যক্ষ্মা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দেয়া হয়। তাই এই রোগের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত তা শনাক্ত করে চিকিৎসা নিতে হবে। যক্ষ্মা হলে শরীরে ক্ষয় বেশি হয়। মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে। তাই দ্রুত শনাক্তের পর চিকিৎসা নেওয়া অনেক বেশি জরুরি। যক্ষ্মার এখন চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক উন্নত। যক্ষ্মা প্রতিরোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের কর্মীরা প্রতিটি ইউনিয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের কর্মীরা সরাসরি রোগীর মুখে ওষুধ তুলে খাইয়ে দেয়। আমাদের সচেতনতার বিকল্প নেই। যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করার পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নজর দিতে হবে এবং সবাই সচেতন হলেই ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশকে যক্ষ্মামুক্ত করা সম্ভব হবে।’

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে যক্ষ্মা ঝুঁকিপূর্ণ ২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। বাংলাদেশের আগে আছে ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান। ২০২০ সালের জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রতিবেদনে দেখা যায় প্রতিলাখে ২২১ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে।

সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি দেবেন্দ্রনাথ গাইনের সভাপতিত্বে ও অ্যাডভোকেসি অফিসার দিপা রাণীর পরিচালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা শিক্ষা অফিসার আবুল খায়ের, সিভিল সার্জন অফিসের রোগনিয়ন্ত্রক মেডিক্যাল অফিসার ডা. জয়ন্ত সরকার, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফরহাদ জামিল, সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সভারঞ্জন শিকদার, হেডের নির্বাহী পরিচালক লুইস রানা গাইন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডল, জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতর প্রোগ্রাম অফিসার ফাতেমা জোহরা প্রমুখ। ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন মেডিক্যাল অফিসার ডা. ইসমত জাহান সুমনা।