খুলনা সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বানিয়াখামার বস্তিতে বাস করেন ২৮ বছরের লাভলী খাতুন। দুই বছর আগেও প্রতিটি দিন ছিল উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তায় ভরা। দিনমজুর স্বামী, চার বছরের ছেলেকে নিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে একঘরে থাকতেন। কষ্টে জীবনযাপন করতেন। এমন অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন লাভলী। স্বপ্ন পূরণের জন্য ভর্তি হন সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্রে। প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন কেনেন। শুরু করেন কাজ। হাঁটি হাঁটি পা পা করে পথচলা শুরু হয়। এর মধ্যে অনেক কিছু বদলে গেছে। এই কাজ করে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন, তেমনি সংসারের হাল ধরেছেন এই নারী উদ্যোক্তা।
এমন হতাশা ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন খুলনা শহরের বস্তিতে বাস করা তিন হাজার ৫৭৫ জন নারী। অনিশ্চয়তার বেড়াজাল থেকে বের হয়েছেন তারা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে অবদান রেখে সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন। পোশাক তৈরি, সৌন্দর্য পরিচর্যাকারী ও খাদ্য উৎপাদক হয়ে উঠেছেন। নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন পরিবারের দায়িত্ব ও সন্তানের ভবিষ্যত। দারিদ্র্য জীবনকে সফলতায় বদলে দিলেন তারা।
লাভলী খাতুনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রম করতেন। কিন্তু কিছুতেই ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। বিয়ের পর দিনমজুর স্বামীর আয়ে সংসার ঠিকমতো চলছিল না। নানা কাজ করতে হতো। এর মধ্যে পায়ে একটি ফোড়া ওঠে। ব্যথায় হাঁটাচলা করতে পারতেন না। পরে অস্ত্রোপচার করা হয়। ফলে দীর্ঘ সময় দাঁড়াতে কিংবা হাঁটতে পারতেন না। এজন্য কোনও কাজ করতে পারছিলেন না। প্রতিটি দিন অনিশ্চয়তায় ভরা ছিল। প্রায়ই রাতে জেগে জেগে ভাবতেন আগামীকাল পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচবেন। একদিকে সংসারে অভাব অন্যদিকে শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ; সবমিলিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। ২০২৪ সালে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের টিভিইটি প্রোগ্রামে যুক্ত হন। সেলাই কাজের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ঋণ নিয়ে সেলাই মেশিন কেনেন। ঘরে বসে দর্জির কাজ শুরু করেন। সেই আয় দিয়ে বদলে যেতে থাকে তার জীবন।
নিজের এই ব্যবসা দাঁড় করানোর বিষয়ে লাভলী খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও সঞ্চয় ছাড়াই একটি সমবায় সমিতি থেকে ৩১ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বৈদ্যুতিক সেলাই মেশিন কিনেছি। এই সিদ্ধান্ত আমার নতুন জীবনের সূচনা করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঘরে বসে সেলাইয়ের ব্যবসা শুরু করি। পাশাপাশি ঘরের এক কোণে সেলাই কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করি অন্য নারীদের। আমার ১২ জন নিয়মিত গ্রাহক আছেন। ৪০ জনের বেশি গ্রাহক প্রায় সময়ে অর্ডার দেন। এখন মাসে ১০ হাজারের বেশি টাকা আয় হয়। এটি দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানকে পড়াশোনা করাচ্ছি। এখন পরিবার এবং সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আমি চিন্তামুক্ত। আমার ছেলেকে ডাক্তার বানানোর আশা আছে। যাতে দরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে পারে। এর পাশাপাশি দিন দিন আশপাশের নারীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ দিই। তারাও প্রশিক্ষণ নিয়ে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন।’
লাভলীর মতো খুলনা শহরে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ড এলাকার ৩ হাজার ৫৭৫ জন নারীর জীবনমান উন্নয়ন হয়েছে। তাদের একজন ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা পান্না আক্তার পুতুল। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ছয় বছরের ছেলেসন্তানকে নিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। সুস্থ স্বাভাবিক শিশুসন্তান দুই বছর বয়সে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায়। তারপর থেকে প্রতিবন্ধকতায় আবদ্ধ। বাবার বাড়িতে থাকলেও সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাতে হতো। গত বছর বিউটিফিকেশনের ওপর প্রশিক্ষণ নিই। এরপর এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে পারলার দিয়েছি। এখন মাসে ১০-১৫ হাজার টাকা আয় হয়। তা দিয়ে সন্তানের পাশাপাশি সুন্দরভাবে সংসার চালাতে পারছি।’
নগরের দারুসসালাম মহল্লার মছির উদ্দিন সড়কের বাসিন্দা রওজা ইসলাম খুলনা সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম বাবা বেকার হয়ে পড়ায় আর্থিক চাপে পড়ে যান। তিনি পরিবারের বড় সন্তান। তাই পড়াশোনার খরচসহ পরিবারকে চালানোর বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়। সেই ভাবনা থেকে খাদ্য উৎপাদন বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ৫৪ দিনের প্রশিক্ষণ নেন গত বছর। প্রশিক্ষণ শেষ করেই ঘরে বসেই খাবার তৈরি ও অনলাইনে বিক্রি শুরু করেন। হোম মেড খাদ্য উৎপাদনে এখন সবার কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছেন। তা থেকে মাসে অন্তত ১০ হাজার টাকা আয় করছেন। তা দিয়ে চলছে পড়াশোনা এবং সংসারের খরচ। তিনি জানিয়েছেন, ঘরে তৈরি খাবারের চাহিদা থাকায় সবাই কমবেশি অর্ডার দিচ্ছেন।
খুলনা সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে অনার্সে ভর্তির অপেক্ষায় আছেন দারুসসালাম মহল্লার মছির উদ্দিন সড়কের বাসিন্দা অথৈই রহমান রাখী। কয়েক মাস আগে খাদ্য উৎপাদন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। শিখেছেন ৭০টি খাবার তৈরির প্রক্রিয়া। এখন ঘরে বসে খাবার তৈরি করেন, আর অনলাইনে বিক্রি করছেন। আপাতত নিজেই খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন। তা থেকে ভালোই আয় হচ্ছে বলে জানালেন।
হাতেম আলী সড়কের বাসিন্দা বাবলী আক্তারের দিনমজুর স্বামীর আয়ে সংসার চলে না। দুই মেয়ের ভবিষ্যত ভাবনায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে বিউটিফিকেশনের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে ভাড়া বাসায় গড়েছেন পারলার। ইতিমধ্যে এলাকায় পরিচিতি অর্জন করেছেন। পাঁচটি হেয়ারকাটসহ মেকআপের সব প্রক্রিয়া শিখেছেন। ঘরে বসেই কাজ করে আয় করে পরিবারের সবার মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলেছেন।
এসব বেকার ও সঞ্চয়হীন নারী এবং উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে সহায়তা করছে প্রদীপ্ত সমবায় সমিতি। এর সভানেত্রী প্রতিভা মিস্ত্রি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছি আমরা। পরিবারে মতামত প্রদান, সিদ্ধান্ত নেওয়া, আর্থিক উন্নয়নে সহায়তা করা, সঞ্চয় করা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করে তোলাসহ নারীর ক্ষমতায়ন সৃষ্টিতে কাজ করছে প্রদীপ্ত সমবায় সমিতি।’
এই অঞ্চলের কর্মহীন নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলছে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ নামের একটি সংস্থা। এই সংস্থার খুলনা শহর এরিয়ার প্রোগ্রাম-২-এর ম্যানেজার সুরভী বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেকারদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে শনাক্তকরণ, দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণসহ ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেওয়া, চাকরি নিশ্চিত, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উদ্দীপনা, প্রয়োজন যাচাই করে সহায়তা দেওয়া এবং নিয়মিত মনিটরিং করে যাচ্ছি আমরা।’
এ বিষয়ে ওয়ার্ল্ড ভিশন খুলনার এরিয়া প্রোগ্রামের কো-অর্ডিনেশন অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার ফুলি সরকার বলেন, ‘খুলনা সিটির ৩১টি ওয়ার্ডেই শহর এরিয়া প্রোগ্রাম ১ ও ২ নামে নারী ও শিশুদের ভাগ্য উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিশু সুরক্ষা, জেন্ডার ডেভেলপমেন্ট, শিশুদের পুষ্টি, শিশু বিবাহ রোধ, শিশুশ্রম, মাদক প্রতিরোধ, যুব উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, প্লাস্টিক রোধে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি আমরা। এ বছর ১০৫ নারী, ৪৩ জন প্রতিবন্ধীসহ ৬৪ জন বেকার যুবক কারিগরি শিক্ষা নিয়েছেন। গত বছর ১২০ জন নারী-পুরুষকে কারিগরি শিক্ষার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে তাদের ৫০ শতাংশের বেশি কাজে যুক্ত। তারা একেকজন ২০-২৫ হাজার টাকা আয় করছেন। উল্লেখযোগ্য হারে নারীরা স্বাবলম্বী হয়েছেন। ১০ নম্বর ওয়ার্ডের পিয়া, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পুষ্প দাস সেলাইয়ের কাজ করে ১৫ হাজার টাকা আয় করছেন। ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের সুমাইয়া কম্পিউটারের দোকানে কাজ করেন, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের তানিয়া ও নুসরাত সেলাইয়ের কাজ করে মাসে ১৫ হাজার টাকা আয় করছেন। এই অঞ্চলে আরও যারা বেকার আছেন, তাদের পর্যায়ক্রমে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে।’