বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে ভিডিও ধারণ, ধরে গণপিটুনি দিলেন ছাত্রীরা

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ হলের ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারণের সময়ে হল ক্যান্টিনের এক কর্মচারীকে হাতেনাতে ধরে গণপিটুনি দিয়েছেন ছাত্রীরা। বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওই হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। আটক কর্মচারীর নাম ইমাম হাসান। এ ঘটনার বিচার এবং ক্যাম্পাসে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওয়াশরুমে একটি সন্দেহজনক মোবাইল ফোন দেখতে পেয়ে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখেন। পরে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে হলের ক্যান্টিনের কর্মচারী ইমাম হাসানকে আটক করেন তারা। তিনি প্রায় দুই বছর ধরে ওই হলের ক্যান্টিনে কর্মরত। অভিযুক্তের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিক গোপন ভিডিও পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে গোপনে ধারণ করা ভিডিও বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ ঘটনায় তার স্ত্রীর সম্পৃক্ততা ছিল।

বিষয়টি জানাজানি হলে হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে শিক্ষার্থীরা অভিযুক্তকে আটকে রেখে মারধর করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানান।

এরপর যৌন হয়রানির বিভিন্ন ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতার অভিযোগ তুলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদি চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘অতীতেও শিক্ষকদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির বেশ কয়েকটি ঘটনায় প্রশাসন কোনও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। তাই এবার সুষ্ঠু বিচার ও দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসের সব কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’

আন্দোলনের অংশ হিসেবে আজ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, পকেট গেট, প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘অভিযুক্ত ইমাম হাসান শিক্ষার্থীদের মারধরের শিকার হওয়ায় তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন ইমাম হাসানের স্ত্রীও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তিনি ইমাম হাসানকে ছাড়িয়ে নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন এবং ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখান। এজন্য তার স্ত্রীকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক সহকারী পরিচালক মো. হাসান মাসুদ বলেন, ‘বুধবার রাতের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযুক্তকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন হরিণটানা থানায় হস্তান্তর করেছে। শিক্ষার্থীরা আজ ক্লাস বর্জন করে বিভিন্ন হল ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। আমরা এখন বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছি। দুপুর পর্যন্ত এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের দাবি, অভিযুক্তকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করতে হবে।’

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে হলের শিক্ষার্থীরা সেখানে জড়ো হন। পরে অভিযুক্তকে হলের ভেতরে আটকে রাখা হয় এবং বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। ঘটনার পর থেকে আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ছাত্রী জানান, ছাত্রী আবাসিক হলের মতো একটি সংরক্ষিত স্থানে এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট প্রফেসর সেলিনা আহমেদ বলেন, ‘ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আমি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাই না। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হবে।’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রফেসর এস এম মাহবুবর রহমান সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি সমাধানের জন্য মিটিং চলছে আমাদের। মিটিং শেষ হলে কথা বলবো।’