‘আমি ভারতের নাগরিক, স্বামী-সন্তানের কাছে ফিরিয়ে দিন, তারা আমার জন্য কাঁদছে’

ভারতের মুম্বাই থেকে তুলে এনে শাহিদা ফকির নামে দেশটির এক নাগরিককে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এখন ভারতীয় সেই নারী চরম সহায়হীন অবস্থায় আশ্রয় নিয়েছেন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়ায় ইউনিয়নের ভাদিয়ালি গ্রামে। বর্তমানে তিনি স্থানীয় আবুল বাশার ও আরিফা দম্পতির বাড়িতে আছেন। সেখানে বসে কাঁদছেন তিনি।

শাহিদা ফকির জানান, তিনি গত ২০ বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে মুম্বাইয়ে বসবাস করে আসছিলেন। চলতি মাসের ১৮ বা ১৯ তারিখ রাতে মুম্বাইয়ের একটি স্থানীয় বাজার থেকে সবজি-রুটি কিনে ফেরার পথে ভারতীয় সিআইডি পরিচয়ে ৪-৫ জনের একটি দল তাকে তুলে নিয়ে যান। তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় ভারতীয় নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও তা দেখতে অস্বীকৃতি জানান তারা।

তিনি জানান, তাকে কোনও যোগাযোগের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি মুম্বাইয়ের চেম্বুর ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে চার দিন আটকে রাখা হয়। স্বজনরা পরিচয়পত্র ও নথিপত্র নিয়ে গেলেও তা বিবেচনা করা হয়নি। পরে তাকে বিমানে করে আসাম সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জোরপূর্বক বাংলাদেশে সীমানায় ঠেলে দেওয়া হয়। তাদের ৫-৬ জনের গ্রুপ করে সীমান্ত পার করার পর দলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কোনও উপায় না পেয়ে এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ অবস্থায় বেনাপোল এলাকায় পৌঁছান তিনি।

ভুক্তভোগী এই নারী জানান, তার বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটে। ওই বাড়িতে শ্বশুরের মৃত্যু হওয়ার খবর পেয়ে তার স্বামী ঘটনার এক মাস আগে কাজের জায়গা মুম্বাই থেকে গ্রামে চলে আসেন। শাহিদা ফকিরের দেওয়া তথ্যমতে, ভারতই তার স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম গোবিন্দপুর, ইউনিয়ন/থানা: বেড়াচাঁপা, মহকুমা: বসিরহাট, জেলা: উত্তর ২৪ পরগনা, রাজ্য: পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার বিকালে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ২৩ ও ১৪ বছর বয়সী দুটি সন্তান ভারতে রয়েছে। আমি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার গোবিন্দপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। গুগলে সার্চ করলে আমাদের বাড়ির সন্ধান মিলবে। আমি অবিলম্বে আমার নিজ দেশে এবং সন্তানদের কাছে ফিরে যেতে চাই। সেখানে স্বামী-সন্তান আমার জন্য কাঁদছে। তাদের কাছে আমাকে ফিরিয়ে দিন।’

তাকে আশ্রয়দানকারী ভাদিয়ালি গ্রামের গৃহবধূ আরিফা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তার স্বামী আবুল বাশার ডাক্তার দেখানোর জন্য ভারত থেকে ফেরার সময় বেনাপোলে কাদামাটি মাখা ও কায়িক যন্ত্রণায় কান্নাকাটি করতে থাকা শাহিদা ফকিরকে দেখতে পান।

আরিফা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তার অবস্থা দেখে যে কারও চোখে পানি আসবে। গায়ে কাদামাটি, জামাকাপড় ছেঁড়া এবং হাত-পা ফোলা অবস্থায় কান্নাকাটি করছিলেন। পুলিশে ধরলে যেমন অত্যাচার করে, তেমনই অবস্থা হয়েছিল। তিনি কান্নাকাটি করে আমার স্বামীকে বলেছিলেন, চাচা আমারে একটু আপনার বাসায় নিয়ে যান, আমার ছোট বাচ্চা আছে ভারতে। আমার কাছে কোনও টাকা-পয়সা নেই। মানবিক দিক বিবেচনা করে আমার স্বামী তাকে এনেছেন। গত পাঁচ দিন ধরে আমাদের বাড়িতে আশ্রয়ে রাখা হয়েছে।’

তিনি আরও জানান, বুধবার ঢাকা থেকে আসা দুই জন সাংবাদিক তাদের বাড়িতে খোঁজখবর নিতে এসেছিলেন। তারা বিষয়টি আবুল বাশারের কাছ থেকে শুনেছেন এবং সরকারি ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই নারীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন।

এ ব্যাপারে সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) ইকবাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৩ নম্বর ওয়ার্ডে আপাতত কোনও মেম্বার না থাকায় আমি স্থানীয়ভাবে খোঁজখবর নিয়েছি। ভারত থেকে এক নারী এসে ভাদিয়ালি গ্রামে আশ্রয়ে আছেন- ঘটনাটি সত্য। তিনি আমাদের স্থানীয় সীমান্ত দিয়ে ঢোকেননি, ভারতের দূরবর্তী কোনও এলাকা দিয়ে তাকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে।’

সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাজমা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই, খোঁজখবর নিয়ে জানাচ্ছি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘বিষয়টি এখনই সাংবাদিকদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছি।’

যা বলছেন মানবাধিকারকর্মীরা

এ প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলায় কথা বলার কারণে একজন নারীকে বাংলাদেশি বলে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অন্যায় নয়; এটি ভাষাগত বৈষম্য, মানবিক মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। ভাষা কখনোই কোনও মানুষের নাগরিকত্বের প্রমাণ হতে পারে না। বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা, আবার ভারতেরও অঞ্চল ভেদে কোটি কোটি মানুষের মাতৃভাষা। ফলে বাংলা ভাষায় কথা বলাকে সন্দেহের কারণ হিসেবে দাঁড় করানো অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো একজন নিজ দেশের নাগরিকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এমন আচরণ। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া একজন নাগরিককে ভিনদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা, অপমান করা বা সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে জোর করে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা কোনও গণতান্ত্রিক আচরণ হতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে এমন আচরণ মানবিক মর্যাদার পরিপন্থি এবং নিষ্ঠুর বলেই বিবেচিত। বিশেষ করে একজন নারীর ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিজ্ঞতা আরও বেশি উদ্বেগের। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উচিত ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত করে ওই নারীকে অবিলম্বে তার নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে তার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কেননা রাষ্ট্রের শক্তি মানুষের অধিকার রক্ষায়, তাকে অস্বীকার করার মধ্যে নয়।’

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকারকর্মী কিরীটী রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘ভারত সরকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এরকম একটা আইন পাশ করেছে বিধানসভা এবং লোকসভায় আমরা যেটাকে বেআইনি মনে করছি। পুলিশ ও বিএসএফের হাতে এরকম ক্ষমতা দিয়েছে যে মানুষকে চিহ্নিত করবে বিদেশি বলে, বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা বলে এবং তাদেরকে ওপারে পাঠিয়ে দেবে। আদালতের এখানে কোনও জায়গাই নেই। আমরা এগুলোর বিরোধিতা করছি। এরকমভাবেই শাহিদা এবং তার মতো ভারতীয় নাগরিকদের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা আন্তর্জাতিক নিয়ম, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা যা কিছুই বলুন সমস্ত জায়গা থেকে আমরা এটার বিরোধিতা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই মেয়েটা সুস্থভাবে তার বাড়িতে ফিরে আসুক, তার পরিবারের কাছে ফিরে যাক।’