কলকাতায় আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ নয় জনের মৃত্যুর পর প্রশাসনিক অভিযানে একের পর এক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীরা। অনেকেই বাধ্য হয়ে কলকাতা ছাড়ছেন। কেউ নতুন হোটেল খুঁজে হয়রান হচ্ছেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরে আসছেন।
কলকাতা থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে প্রশাসনের অভিযানে একের পর এক আবাসিক হোটেল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে এসব এলাকায় থাকা বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসাপ্রত্যাশীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসছেন।
মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে গত ১৯ আগস্ট রাত ২টার দিকে অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ নয় জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর কলকাতা প্রশাসন বিভিন্ন হোটেল ও অতিথিশালায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা শুরু করে। এরই মধ্যে ৯১৯টি আবাসিক হোটেল ও অতিথিশালায় অভিযান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪১টিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও অন্যান্য পরিকাঠামো সঠিক পাওয়া গেছে। বাকি হোটেলগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা বিধি ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ঘাটতি পাওয়ায় অধিকাংশই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
কলকাতার এসব এলাকা বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত। কিন্তু শিখা ইন-এর দুর্ঘটনার পর সেই পরিচিত এলাকাই এখন অনেকের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বাংলাদেশি পরিবার স্বজনদের ফোন করে দ্রুত দেশে ফিরে আসতে বলছেন।
শুধু আতঙ্ক নয়, হোটেল সংকটও নতুন করে ভোগান্তি তৈরি করেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া হোটেল থেকে বের করে দেওয়া পর্যটকদের অনেকেই এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে ঘুরছেন। কোথাও নতুন করে থাকার জায়গা পাওয়া গেলেও আগের তুলনায় বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ফিরে আসা কয়েকজন যাত্রী জানিয়েছেন, কিছু হোটেল ভাড়া দেড় থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভারতফেরত পাসপোর্টধারী যাত্রী সোহেল রানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য পরিবার-পরিজন নিয়ে ১৬ আগস্ট ভারতে গিয়েছিলাম। কলকাতার বড়বাজার এলাকার একটি হোটেলে ছিলাম। ১৯ আগস্ট শিখা ইন হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে কলকাতার আবাসিক হোটেলগুলোতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকায় অধিকাংশ হোটেল বন্ধ করে দিচ্ছে। আমরাও যে হোটেলে ছিলাম, পুলিশ সেটিও বন্ধ করে দিয়েছে। আরও এক সপ্তাহ থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু হোটেলগুলো সিটের ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ায় নিরাপত্তা ও অর্থ সংকটের কারণে আগেই দেশে চলে আসলাম।’
ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ফরিদপুরের সুমন সাহা বলেন, ‘স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারতের কলকাতা যাচ্ছি। কিছুদিন আগে একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শুনছি অনেক হোটেল বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক আতঙ্ক নিয়ে ভারতে যাচ্ছি। ঠিকমতো হোটেলে সিট পাব কি না, সেটিও চিন্তার বিষয়।’
কলকাতার পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশি পর্যটকদের কেন্দ্র করে এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে আবাসিক হোটেল, খাবারের হোটেল, পরিবহন, কেনাকাটা ও বিভিন্ন পরিষেবার ব্যবসা। করোনাকাল থেকে শুরু করে গত কয়েক বছরে নানা কারণে এসব ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে।
পর্যটক ভিসা চালু হওয়ায় যাত্রীর সংখ্যা কিছুটা বাড়তে শুরু করার সময় নতুন করে হোটেল বন্ধের ঘটনা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা হোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুর রহমান বলেন, ‘গত কয়েক দিনের হিসাব দেখে বোঝা যাচ্ছে, আগের চেয়ে যাত্রী ফিরে আসার সংখ্যা কিছুটা বেশি। তবে কী কারণে এই সংখ্যা বাড়ছে, সে বিষয়ে আমার কাছে সঠিক তথ্য নেই। দুই দেশের মধ্যে যাত্রী যাতায়াত স্বাভাবিক আছে।’