মসলা জাতীয় ফসল ও ফলের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানীদের সাফল্য

গামা রশ্মি ব্যবহারের মাধ্যমে গবেষণা করে ময়মনসিংহস্থ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বিনার বিজ্ঞানীরা মসলা জাতীয় ফসল পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ, সবজি জাতীয় ফসল ও বিভিন্ন ফলের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধিতে সাফল্য পেয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই গবেষণার ফলে কৃষিপণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমে আসবে এবং বিদেশে রফতানি করে কৃষকরা লাভবান হবেন।

পেঁয়াজের আমদানি নির্ভরতা কমাতে ওজন হ্রাস ও পচনরোধে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বিনার উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের বিজ্ঞানীরা মসলা জাতীয় ফসল পেঁয়াজ, আদা, রসুন, সবজি জাতীয় আলু, পটল, করলা ও ফল জাতীয় আম, কলায় গামা রশ্মি ব্যবহারের মাধ্যমে সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি করতে ২০২০ সালে কাজ শুরু করেন। গবেষণায় দীর্ঘ ট্রায়ালের মাধ্যমে এসব ফসলের ওজন হ্রাস ও পচনের মাত্রা অনেকাংশেই কমে আসে এবং পেঁয়াজে অংকুরোধগম হয় না। এর ফলে ৭ থেকে ৯ মাস সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি পেয়েছে।

ডিনার উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নাসরিন আখতার জানান, দেশে মসলা জাতীয় ফসলের মধ্যে পেঁয়াজ অন্যতম। ২০২০-২১ সালে বাংলাদেশে ১ লাখ ৯৪ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। ওই সময়ে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ছিল ৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন। উৎপাদিত পেঁয়াজের মধ্যে ৩০ শতাংশ পচে যাওয়ার কারণে উৎপাদিত পেঁয়াজ দাঁড়ায় ১.৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বাকি চাহিদা পূরণের জন্য পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়েছে। পেঁয়াজসহ অন্যান্য ফসলের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বিনার বিজ্ঞানীরা ২০২০ সালে এসব ফসলে গামা রশ্মি ব্যবহার করে গবেষণা শুরু করেন।

তিনি আরও জানান, গামা রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে পেঁয়াজসহ অন্যান্য ফসলের ওজন হ্রাস, পচন ও স্পাউটিং কমিয়ে আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। এই পদ্ধতির মাধ্যমে ফসলের গুণগত মান বজায় রেখে সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে পেঁয়াজসহ অন্যান্য ফসলের সংরক্ষণ উত্তর ক্ষতি কমবে এবং অসময়ে বাজারে এসব ফসলের যোগান দিয়ে দাম স্থিতিশীল রাখবে।

শুধু পেঁয়াজ না, আদা, রসুন, আলু, সবজি, টমেটো, করলা, পটল, আম, কলাসহ সর্বশেষ পান নিয়ে এই গবেষণা চলছে। পেঁয়াজের গবেষণালব্ধ ফলাফল সম্পর্কে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. রফিকুল ইসলাম জানান, দেশে উচ্চ তাপমাত্রা ও উচ্চ আদ্রতার কারণে কৃষকরা নিজ বাড়িতে দুই থেকে তিন মাস পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রাখতে পারে। ফলে পরবর্তী পর্যায়ে কৃষককে উচ্চ মূল্যে পেয়াঁজ ক্রয় করতে হয় এবং বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। গবেষণার ফলাফলে প্রতীয়মাণ হয়, গামা রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় সাত থেকে নয় মাস পর্যন্ত কৃষক নিজ বাড়িতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রাখতে পারবে। এর ফলে বাংলাদেশে পেঁয়াজের আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় রোধ হবে। শুধু পেঁয়াজ না, এ রকম মসলা সবজি এবং ফুল জাতীয় ফসলেও গামা রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি করা যায়।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট মিনার মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গামা রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের সংরক্ষণকাল বেড়ে গেলে তা রফতানি করে বিদেশের বিভিন্ন বাজার দখলে আসবে। এতে করে একদিকে কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ হবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।

মহাপরিচালক আরও জানান, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণকাল বাড়ানোর লক্ষ্যে গাজীপুরে বৃহৎ আকারে ইরাডিয়েশন সেন্টার স্থাপনের প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। এই প্রকল্পের কাজ শেষে পেঁয়াজসহ কৃষিপণ্যে গামা রশ্মি প্রয়োগের ব্যবস্থা করা গেলে এসব পণ্যের সংরক্ষণকাল ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে করে কৃষিপণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমে আসবে এবং কৃষক ব্যাপক লাভবান হবে।