ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) না থাকায় প্রতিদিন মৃত্যু বাড়ছে বলছেন রোগীদের স্বজনরা। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, আন্তরিকতা দিয়েই শিশুদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে তারা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে সোমবার (০৪ মে) পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৬৯ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে ৯৬৩ জন বাড়ি ফিরে গেছে। আর ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি শিশুরা চিকিৎসাধীন আছেন। এই হিসাবে মার্চ মাসে সাত, এপ্রিল মাসে ১৫ এবং মে মাসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
আক্রান্ত শিশুদের স্বজনরা জানিয়েছেন, চিকিৎসকের পরামর্শে আইসিইউর দরকার হয় অনেক শিশুর। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে খুঁজেও পাচ্ছেন না। এর মধ্যে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়। আইসিইউ সংকটের কারণে এমন হয়।
ঠান্ডা, সর্দি, জ্বর এবং হাম
প্রথমে ঠান্ডা ও জ্বরে আক্রান্ত। তা থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে সদরের ভাবখালি গ্রামের মেহেদী হাসান ও মনি আক্তার দম্পতির সাড়ে ছয় মাসের ছেলে তাসফিন আহমেদকে ২৩ এপ্রিল ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর তার ফুসফুসে গুরুতর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তখন আইসিইউর প্রয়োজন হয়। কিন্তু হাসপাতালে আইসিইউ না থাকায় চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার করেন। মেহেদী-মনি দম্পতি ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান। ঢাকার বেশ কয়েকটি হাসপাতালে ঘুরে আইসিইউ না পেয়ে আবার বাধ্য হয়েই ময়মনসিংহ হাসপাতালে এনে পরদিন ছেলেকে ভর্তি করেন। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক আইসিইউর বিকল্প হিসেবে বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতিতে শ্বাসকষ্ট নিবারণের জন্য অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। এরপর শিশুটি ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে।
তাসফিনের মা মনি আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তাসফিনকে ঢাকায় নেওয়ার পর অনেক চেষ্টা করেছি, অনেক হাসপাতালে ঘুরেছি। কিন্তু কোথাও আইসিইউ বেড পাইনি। পরে আবার তাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এনে ভর্তি করি। এখন ছেলের শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা ভালো।’
আরেক শিশুর অভিভাবক কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমার মেয়ের বয়স সাত মাস। প্রথমে জ্বর আসে, পরে হামের মতো লালচে দানা বের হয়। এরপর ময়মনসিংহ হাসপাতালে ভর্তি করি। বর্তমানে চিকিৎসা চলছে। বেশিরভাগ ওষুধ হাসপাতাল থেকে দেওয়া হচ্ছে। তবে হাসপাতালে আইসিইউ থাকলে ভালো হতো।’
এ ব্যাপারে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মাজহারুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন আইসোলেশন ওয়ার্ডে রোগীরা ভর্তি হচ্ছে। বর্তমানে ৮২ শিশু চিকিৎসাধীন আছে। তবে অনেক শিশুর আইসিইউর প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখানে শিশুদের জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা নেই। যেসব শিশুর গুরুতর শ্বাসকষ্ট হয় এবং অক্সিজেন সরবরাহ করতে হয়, তাদের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতিতে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে। বাবল সিপ্যাপ তৈরি করেছেন আইসিডিডিআরবি’র গবেষকরা। তাদের প্রেসক্রিপশন মতোই চলছে চিকিৎসা। অল্প খরচে এই পদ্ধতিতে অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব হয়। বাকি রোগীদের আন্তরিকতা দিয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।’
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধপত্রসহ সব ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের কিছুটা হিমশিম খেতে হয়। এরপরও চিকিৎসকরা আন্তরিকতা দিয়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। শিশুদের জন্য আইসিইউ বেডের কথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এখনও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। পেলে দ্রুত প্রতিস্থাপন করা হবে।’