‘হাসপাতালে আগুন না লাগলে আমার স্বামী তো মারা যেত না। আগুন লাগার খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে যায় আমার স্বামী। ভিড়ের মধ্যে মানুষের পায়ের পাড়া খেয়ে অসুস্থ হয়ে স্বামী আমার মারা গেছে। এত বড় হাসপাতালের একটা সিঁড়ি বাদে সবগুলোতে তালা মেরে বন্ধ রাখায় এ ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে আমার স্বামীকে হারালাম। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
আহাজারি করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লিফটে আগুন লাগার ঘটনায় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে নিহত ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের কৃষক রমজান মিয়ার স্ত্রী খাদিজা আক্তার।
তিনি জানান, স্বামীর অকাল মৃত্যুতে সংসার এখন কীভাবে চলবে তা নিয়ে চিন্তিত তিনি। পরিবারে আয়ের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। সরকার অসহায় পরিবারকে সহায়তা করবে- এমনটাই দাবি জানান খাদিজা আক্তার।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বাদ জোহর রমজান আলীকে জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
শুধু রমজানের বাড়ি নয়, একই উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের নিহত শাহজাহানের বাড়িতে একই অবস্থা। শাহজাহানের স্ত্রী হারিসা আক্তার বলেন, ‘হাসপাতালে লিফটে আগুন লাগার পর রোগী ও সাধারণ মানুষ দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। সিঁড়িতে নামতে গিয়ে আমি ও আমার স্বামী দুজনেই নিচে পড়ে যাই। আমাদের ওপর দিয়ে মানুষ পাড়া দিয়ে যায়। মানুষের পায়ের আঘাতে স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ে মারা যায়। আগুন না লাগলে তো আমার স্বামীর এমন মৃত্যু ঘটতো না। এমনভাবে স্বামী মারা যাবে বুঝতে পারিনি। এখন পরিবারটি চলবে কীভাবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। আমার স্বামীর মৃত্যু জন্য যারা দায়ী তাদের বিচার চাই।’
মঙ্গলবার সকাল ১১টায় শাহজাহানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় এলাকার অসংখ্য মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
একই উপজেলা দুই জনের মৃত্যুতে পরিবারসহ সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জানাজায় অংশগ্রহণকারী স্থানীয়রাও এ ঘটনায় বিচার দাবি করেন।
এদিকে, হাসপাতালে পদতলিত হয়ে ময়মনসিংহের তারাকান্দার বালিকা এলাকার নিহত কুলসুম বেগমের পরিবারেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কুলসুম বেগমকে হারিয়ে পুত্র ও কন্যা এতিম হয়ে গেছে। মায়ের মৃত্যুর কাহিনী বলতে গিয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে মেয়ে মিম আক্তার বলেন, ‘আমার ভাই আশরাফুল জন্ডিসের আক্রান্ত হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশু ওয়ার্ডে সে ভর্তি ছিল। আগুন লাগার পর অনেক মানুষ ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে যায়। আমিও আমার ভাই ও মাকে নিয়ে নামতে গেলে তিনজনই সিঁড়ি থেকে নিচে পড়ে যায়। মানুষের হুড়োহুড়িতে দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থা ছিল না। আমাদের ওপর দিয়ে মানুষ পা দিয়ে আঘাত করে চলে যায়। আমি ও আমার ভাই কোনোমতে কষ্ট করে পাশে সরে দাঁড়াতে পারলেও মা বের হতে পারেনি। পরে তাকে ইমারজেন্সিতে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’
মিম আক্তার আরও বলেন, ‘হাসপাতালে আগুন না লাগলে আমার মা পদদলিত হয়ে এভাবে মারা যেত না। আমরা দুই ভাই-বোন কীভাবে বড় হবো জানি না।’
কুলসুমের স্বামী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে আগুন লাগার সময় আমি বাইরে ছিলাম। সিঁডি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে আমার স্ত্রী এভাবে মারা যাবে কল্পনাও করিনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। নতুন ভবনের পাঁচটা সিটির মধ্যে চারটায় তালাবদ্ধ ছিল। একসঙ্গে সব রোগী ও সাধারণ মানুষ নামতে যাওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমি এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি।’
এদিকে, হাসপাতালের সহকারী পরিচালক প্রশাসন ও তদন্ত কমিটির সদস্য ডাক্তার মাইনউদ্দিন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট গঠিত তদন্ত কমিটি মঙ্গলবার সকাল থেকেই কাজ শুরু করেছে। নিরপেক্ষভাবে তদন্তে যদি কারও গাফিলতি পাওয়া যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।
উল্লেখ্য, সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লিফটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে পদদলিত হয়ে একজন শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়; যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।









