রাজশাহী চিড়িয়াখানা: বাঘ-সিংহ নেই, আছে শুধু ফাঁকা খাঁচা

বাঘ-সিংহ নেই। আছে ফাঁকা খাঁচা। আর দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা ফাঁকা খাঁচা দেখে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে দর্শনার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। রাজশাহী মহানগরীর শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান উদ্যান ও চিড়িয়াখানার পশু-পাখির সংখ্যা এতটাই কম যে এটিকে এখন আর চিড়িয়াখানা বলা চলে না।

রাজশাহী চিড়িয়াখানার ফাঁকা খাঁচাবাঘ-সিংহ তো নেই-ই, অন্য পশুপাখি যা আছে তার সংখ্যাও নগণ্য। রয়েছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বড় অভাব। বেশিরভাগ খাঁচায় নেই পশুপাখির পরিচিতিমূলক নামফলক। উদ্যানের ভেতরে যত্রতত্র বেড়ে উঠেছে গাছপালা। পড়ে রয়েছে ময়লা-আর্বজনা।

চিড়িয়াখানার পশুপাখিকে বরাদ্দ মতো খাবার দেওয়া হয় না এমন অভিযোগ বহুদিনের। যা দেওয়া হয় তাও পচা-বাসি। ফলে গত ১৮ মে ঝটিকা অভিযান চালান রাজশাহী সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র নিযাম-উল-আযীম। এসময় তিনি পশু-পাখিদের দেওয়া ভেজাল ও পচা-বাসি খাবার জব্দ করেন। দায়িত্বে অবহেলার জন্য তিনি চিড়িয়াখানার ফার্মাসিস্টকে বরখাস্ত ও পশু খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সাকিব এন্টারপ্রাইজের কার্যাদেশ বাতিলের নির্দেশ দেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্তেরও নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর থেকে চিড়িয়াখানার খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রুহুল আমিন টুনু ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুরুজ্জামান টুকুকে।

উদ্যান ও চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখা যায়, খরগোশগুলো নোংরা অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বহুদিন পরিষ্কার করা হয়নি খাঁচার মেঝে। অজগরের সামনে কোনও খাবার নেই। মেছো বাঘগুলো দুর্বল ও হাড্ডিসার। ঘোড়া ও গাধাগুলো রুগ্ন ও দুর্বল। উদ্যানের ভেতর যত্রতত্র ঘাস ও আগাছা।
উদ্যান ও চিড়িয়াখানার সহকারী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল হাই খরগোশের খাঁচা অপরিষ্কারের বিষয়ে বলেন,প্রতিদিনই খরগোশের খাঁচা পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু এরা এতো বেশি ময়লা করে যে পরিষ্কার করার আধাঘণ্টা পর দেখলে মনে হবে অনেকদিন পরিষ্কার করা হয়নি। অজগরের বিষয়ে তিনি বলেন, অজগরের যখন ক্ষুধা লাগে তখন আমরা বুঝতে পারি। তখন অজগর ভেতর থেকে বের হয়ে আসে। তখন তার সামনে দুইটা মুরগি কেটে দেওয়া হয়। এরকমভাবে ৮/১০ দিন পর পর খাবার দেওয়া হয় অজগরকে।

রাজশাহী চিড়িয়াখানার ফাঁকা খাঁচাউদ্যান ও চিড়িয়াখানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. ফরহাদ উদ্দীন জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খারাপ খাবার দেওয়ায় আমরা মেয়রকে জানিয়েছিলাম। তিনি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন।

পশুপাখিকে কেন রুগ্ন ও দুর্বল দেখায় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চিড়িয়াখানার খাঁচাগুলো আসলে অপরিসর। চিড়িয়াখানার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও খাঁচাগুলো ঠিক সেইভাবে বড় করা যায়নি। পশুপাখির মুভমেন্টের জন্য যে পরিমাণ জায়গা দরকার তা এই চিড়িয়াখানায় নেই। তাই এখানকার পশু-পাখি রুগ্ন ও দুর্বল দেখায়। তবে অতিদ্রুত খাঁচাগুলো বড় করা হবে।

পশুপাখির পরিচিতিমূলক কোনও ফলক নেই কেন জানতে চাইলে তিনি জানান,গত তিনদিন আগে নামফলকগুলো খুলে নিয়ে আসা হয়েছে। লেখাগুলো বিবর্ণ হয়ে যাওয়ায় নতুনভাবে লেখা হচ্ছে। আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যে আবার লাগানো সম্ভব হবে।

নতুন পশু-পাখি আনার বিষয়ে ডা. ফরহাদ জানান,নতুন পশু-পাখি নিয়ে আসার ব্যাপারেও কথা চলছে।

সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন,২০১০ সালের প্রকল্পটির সব কাজ এখনও শেষ হয়নি। খাঁচা ও ল্যান্ডস্কেপের কাজ বাকি রয়েছে। শেষ করতে আরও অন্তত পাঁচ কোটি টাকার প্রয়োজন। নতুন প্রাণী নিয়ে আসার ব্যাপারে তিনি বলেন, সরাসরি বিদেশ থেকে কোনও প্রাণী নিয়ে আসার মতো তহবিল তাদের নেই।

চিড়িয়াখানায় রয়েছে সাতটি গাধাসূত্র মতে,২০০৩ সালে রাজশাহীর কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় ছিল দুইটি সিংহ,একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ১৯৪টি চিত্রা হরিণ, দুইটি মায়া হরিণ, ২৬টি বানর, ৯টি বেবুন, চারটি গাধা, দুইটি ভালুক, একটি ঘোড়া, দুইটি সাদা ময়ূর, তিনটি দেশি ময়ূর, ৮৫টি তিলা ঘুঘু, ৬৮টি দেশি কবুতর, চারটি শজারু, ২৮টি বালিহাঁস, দুইটি ওয়াকপাখি, একটি পেলিকেন, ছয়টি টিয়া, চারটি ভুবন চিল, চারটি বাজপাখি, একটি হাড়গিল, তিনটি হুতুম পেঁচা, ৯টি শকুন, দুইটি উদবিড়াল, তিনটি ঘড়িয়াল ও একটি অজগর।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় রয়েছে সাতটি গাধা, ২০টি বানর, বেবুন দুইটি, হনুমান ২টি, মায়া হরিণ একটি, চিত্রা হরিণ ৪৪টি, মেছো বাঘ দুইটি, বনবিড়াল ২টি, গন্ধ গোকুল চারটি, ভালুক ১টি, খরগোশ আটটি, হুতুম পেঁচা দুইটি, হাড়গিলা একটি, রাজহাঁস ৪৮টি, বালিহাঁস ৬টি, তিলা ঘুঘু ১২টি,সাদা ময়ূর একটি, কাকাতুয়া একটি, পাতিহাঁস একটি, হাইব্রিড কবুতর ১১০টি, দেশি কবুতর ২০টি, কালিম পাখি একটি, চখা সাতটি, ঘড়িয়াল দুইটি, অজগর একটি, কচ্ছপ তিনটি, বক ৬টি, বড় বক সাদা দুইটি,ওয়াক পাখি একটি, পেলিকেন একটি, চিল একটি, মাছ মুরাল একটি ও তিলা ঘুঘু ৯০টি।

আরও পড়ুন: আদালতে হাজিরা দিলেন খালেদা, সময় আবেদন মঞ্জুর
/জেবি/এমএসএম/আপ-এমও