ছাত্রীকে ধর্ষণের মামলায় তুফানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। আর মা-মেয়েকে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়াসহ নির্যাতনের মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে ১৩ জনের বিরুদ্ধে। সন্ধ্যায় তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর আবুল কালাম আজাদ বগুড়ার কোর্ট ইন্সপেক্টর শাজাহান আলীর কাছে চার্জশিট জমা দেন। এই চার্জশিট সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. কামরুজ্জামানের আদালতে জমা দেওয়া হবে।
ধর্ষণ মামলায় চার্জশিটভুক্তরা হলেন- বগুড়া শহরের চকসুত্রাপুরের মজিবর রহমান সরকারের ছেলে তুফান সরকার (২৭), তার স্ত্রী তাছমিন রহমান আশা (২০), শ্যালিকা পৌর কাউন্সিলর শহরের চকসুত্রাপুর এলাকার জাহিদ হোসেনের স্ত্রী মার্জিয়া হাসান রুমকি (৩৫), তাদের মা শহরের বাদুড়তলার জামিলুর রহমান রুনুর স্ত্রী লাভলী রহমান রুমি (৫৫), তুফান বাহিনীর সদস্য শহরের খান্দার এলাকার মোখলেসুর রহমানের ছেলে আতিকুর রহমান আতিক (২৫), বাদুড়তলার আবদুল বাছেদের ছেলে মো. মুন্না (২৪), চকসুত্রাপুরের দুলু আকন্দের ছেলে আলী আজম দিপু (২৫), শিববাটির জহুরুল হকের ছেলে মেহেদী হাসান রূপম (২৬), একই এলাকার জেল্লাল উদ্দিনের ছেলে সামিউল হক শিমুল (২৫) ও কাহালুর খাজলাল গ্রামের শহিদ আলম খানের ছেলে এমারত আলম খান জিতু (২৩)।
এছাড়া নির্যাতন-মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার মামলায় এই ১০ জন ছাড়াও তুফানের শ্বশুর শহরের বাদুড়তলার মৃত জিল্লুর রহমানের ছেলে জামিলুর রহমান রুনু (৫০), রুমকির গৃহকর্মী একই এলাকার আইয়ুব আলীর স্ত্রী আঞ্জুয়ারা বেগম (৫৫) ও নাপিত গাবতলীর বামুনিয়া গ্রামের জয়লাল রবিদাসের ছেলে জীবন রবিদাস (২৭) রয়েছে।
আসামিদের মধ্যে তুফান গাজীপুরের কাশিমপুরে হাইসিকিউরিটি কারাগারে আছে। শ্বশুর রুনু জামিনে আছেন। শিমুল ও আঞ্জুয়ারাকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। অন্য ৯ জন বগুড়া জেলে আছেন। নাপিত জীবন, আঞ্জুয়ারা ও রুনু এজাহারভুক্ত আসামি নন। শুধু আতিক, দিপু ও নাপিত জীবন আদালতে মা ও মেয়েকে ন্যাড়া এবং নির্যাতনের কথা স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। মামলায় বাদী, চিকিৎসকসহ ২৩ জন সাক্ষী রাখা হয়েছে। আলামত হিসেবে রয়েছে তুফানের প্রাইভেট কার, দুটি ক্ষুর, দুটি কাঁচি, ভিকটিমদের স্বাক্ষর নেওয়া কাউন্সিলর রুমকির পৌরসভার প্যাডের পাতা, নির্যাতনের এসএস পাইপ, মা ও মেয়ের কেটে ফেলা চুল। এসব মঙ্গলবার বিকালে আদালতের মালখানায় জমা দেওয়া হয়েছে। ভিকটিম ছাত্রী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্টে ছাত্রীকে ধর্ষণের প্রমাণ রয়েছে এবং সে নাবালিকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এক ছাত্রীকে ভালো কলেজে ভর্তির নামে তুফান সরকার গত ১৭ জুলাই বগুড়া শহরের চকসুত্রাপুরের বাড়িতে ধরে নিয়ে ধর্ষণ করে। এই ঘটনা কাউকে বললে বাড়িতে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় সে। এরপর তুফানের স্ত্রী তাছমিন রহমান আশা, শ্যালিকা পৌর কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকি ও শ্বাশুড়ি রুমি খাতুনের নির্দেশে গত ২৮ জুলাই ওই ছাত্রী ও তার মাকে রুমকির বাদুড়তলার বাড়িতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আতিক, দিপু, রূপম, মুন্না ওই ছাত্রী ও তার মাকে চার ঘণ্টা ধরে মারধর ও নির্যাতন করে। তারা প্রথমে কাঁচি দিয়ে মা-মেয়ের চুল কেটে দেয়। এতেও সন্তুষ্ট না হয়ে নাপিত ডেকে মা-মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। এরপর তাদের বগুড়া ত্যাগে ২০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় মা-মেয়ে বেঁচে যান। পরে তাদের বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই রাতেই ছাত্রীর মা সদর থানায় তুফান ও রুমকিসহ ১০ জনের নামে ধর্ষণ ও নির্যাতনের পৃথক মামলা করেন।
সদর থানা পুলিশ পরে ১১ জনকে গ্রেফতার করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার ওসি (অপারেশন) আবুল কালাম আজাদ কয়েকদফা রিমান্ডে নিলেও তুফান, আশা, রুমকি ও রুমির স্বীকারোক্তি আদায় করতে পারেননি। এদিকে ৭ আগস্ট হাসপাতাল থেকে ছাড় পাওয়ার পর শিশু আদালতের নির্দেশে ওই ছাত্রীকে রাজশাহীর সেফহোম ও তার মাকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয়। কারাগারে বিলাসী জীবনযাপন ও মাদকসেবনের অভিযোগ ওঠায় তুফানকে গাজীপুরের কাশিমপুরে হাইসিকিউরিটি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ১৫ অক্টোবর
বগুড়ার জেলা প্রশাসক নুরে আলম সিদ্দিকী গত ২৯ জুলাই বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নির্যাতিত ছাত্রী ও মাকে দেখতে গিয়ে এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সেই তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে। কমিটির সদস্য জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, তদন্তের সব কাজ শেষ, শুধু ভিকটিমদের রিপোর্টটি দেখানো ও তাতে তাদের স্বাক্ষর নেওয়া বাকি আছে।
তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও বর্তমানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আবদুস সামাদের নেতৃত্বে এই তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন- বগুড়া সমাজসেবা অধিদফতরের সহকারী পারিচালক ইফফাত তাসলিমা মুনিয়া ও জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম।
আরও পড়ুন- ‘ধর্ষক’ তুফানের পুরো পরিবারই মাদক ব্যবসায় জড়িত