‘ধর্মের নামে এখনও যা চলছে তাতে আতঙ্কগ্রস্ত হই’

মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাসার`দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একসময় এ দেশে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেওয়া যেত না। সবাই আতঙ্কে থাকতো। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর থেকে ৯৬ সালের আগ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেওয়া যেত না। এখন তা পুনরুদ্ধার হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হচ্ছে। কিন্তু ধর্মের নামে এখনও যা চলছে তাতে আতঙ্কগ্রস্ত হই।’ কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহী নহানগরীর টিকাপাড়ার বৌ বাজার এলাকার মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাসার।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা টিঅ্যান্ডটি কলেজের নৈশকালীন বিভাগের ছাত্র ছিলেন আবুল বাসার। দিনে দৈনিক পূর্বদেশের প্রেস বিভাগে চাকরি করতেন তিনি। ২৫ মার্চ রাতে ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদী, ডেইলি পিপলস পত্রিকায় অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেওয়া হলে তিনি পালিয়ে আসেন। তারপর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। বর্তমানে দৈনিক বার্তা পত্রিকায় কম্পিউটার বিভাগে কর্মরত আছেন।

আবুল বাসার বাংলা ট্রিবিউনকে মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়ের কথা বর্ণনা করেছেন।

পাকিস্তানিদের ঢাকা আক্রমণের সময়ে পূর্বদেশ পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন আবুল বাসার। সেই সময়ের কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার মালিক ছিলেন তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা হামিদুল হক। ২৫ মার্চ বেলা ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আমার ডিউটি ছিল। রাতে আমি ঢাকার ফকিরাপুলের মেসে ছিলাম। সে রাতে ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদী, ডেইলি পিপলস পত্রিকায় আগুন দেওয়া হলেও পূর্বদেশ পত্রিকায় দেওয়া হয়নি। ২৫ তারিখের হত্যাযজ্ঞের পর দলে দলে মানুষ ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে থাকে। আমিও ৯০ মাইল পায়ে হেঁটে আমার জন্মস্থান আখাউড়ার উদ্দেশ্যে বের হই। পথে সাধারণ মানুষ আমাদের থাকতে দিয়েছে, খেতে দিয়েছে। দুইদিন পর ২৯ তারিখ আখাউড়া পৌঁছাই। ৩০ তারিখ আখাউড়া থেকে বাবাকে নিয়ে আগরতলা যাই। সেখানে আমার মা ছিল। এপ্রিলের ১১ তারিখ বাবা আবার বর্ডার ক্রস করে গ্রামে প্রবেশ করে। বাবা ছিলেন শ্রমিক নেতা। সব ধরনের মানুষদের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ ছিল। তিনি বর্ডার ক্রস করে গ্রামে ঢুকে থেকে যান। সেখানে তার শ্বশুরসহ আত্মীয়স্বজনরা ছিলেন। আমি ওই সময়টা ইয়ুথ ক্যাম্পের সদস্য হিসেবে বর্ডার এলাকায় ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাকটর ছিলাম। পরে ওখান থেকে আগরতলা নগর ক্যাম্পে ২১ দিনের গেরিলা প্রশিক্ষণ নিই। ‘মেলাঘর’ ক্যাম্পে অস্ত্র নেওয়ার দিন আমার গ্রামের এক ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে শুনতে পাই আমার বাবা ও নানাকে মেরা ফেলা হয়েছে। শুনে আমি মাথা ঘুরে পড়ে যাই। ওইদিন আমাদের অপারেশন বাতিল করা হয়।’

পরে বাবা ও নানার কথা কিছু শুনেছেন কিনা এমন প্রশ্নে আবুল বাসার বলেন, ‘যেদিন আমার বাবা ও নানাকে মেরা ফেলা হয়, সেদিন আমাদের গ্রামের ২৯ জনকে একসঙ্গে গুলি করে মারা হয়। সেদিন ১০০ জনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদাররা। তাদের মধ্যে থেকে যাদের ছেলেমেয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল তাদেরকে গঙ্গাসাগর দিঘির পাড়ে একটি টিনের ঘরে বন্দি করে রেখে নির্যাতন চালানো হতো। পরে ওই দিঘির পাড়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাত ৮টার দিকে গুলি করে ওইখানে দুইটি কবরে পুঁতে রাখা হয় তাদের।’

যুদ্ধের সময় কোন সেক্টরে কাজ করেছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সময় আমি দুই নম্বর সেক্টরে ক্যাপ্টেন হায়দার ও ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে কাজ করি। যুদ্ধের সময় আমাদের ২৪ জনের দলকে সেপ্টেম্বরের মধ্যভাগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা নবীনগর এলাকার সীমরাইল গ্রামে থাকতে দেওয়া হয়। ওই গ্রামে তখন ২৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিল। তিন মাইল লম্বা গ্রাম সীমরাইল। ওই গ্রাম থেকে রাতে আমরা পাকিস্তানি হানাদারদের ক্যাম্পে অপারেশন চালাতাম। পাকিস্তানি হানাদাররা রাতে বের হতো না। আর তখন ছিল বর্ষাকাল। ওই সময় আমাদের কাজ ছিল সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগী হিসেবে পাকিস্তানি আর্মিদের ওপর আক্রমণ চালানো। বিভিন্ন খাবার-দাবার মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে সংগ্রহ করে পাঠানো।’

সেসময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনার প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাসার বলেন, ‘যুদ্ধের সময়ের একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে আমার। আমাদের দলে ছিল ২৪ জন। ২৪ জনকে আবার তিনটা দলে ভাগ করা হয়। প্রতি ভাগে ৮ জন করে সদস্য ছিল। আমি ৮ জনের একটি দলের প্রধান ছিলাম। একবার পাকিস্তানি আর্মিরা সীমরাইল গ্রামে আক্রমণ চালায়। সম্মুখযুদ্ধে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আলমগীর হোসেন মারা যায়। আলমগীর আর আমি আখাউড়া রেল স্কুল থেকে ৬৯ সালে মেট্রিক পাশ করি। পাকিস্তানি হানাদাররা আক্রমণ চালায় রমজান মাসের ১৮ তারিখ। আর আমরা ওকে গার্ড অব অনার দিয়ে ১৯ তারিখে দাফন করি। আলমগীরের ঈদের পর ছুটি নিয়ে আগরতলার ভেতরে গিয়ে ওর মা, ভাই ও বোনের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ তার আর হলো না। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে আলমগীরের বোনকে পাকিস্তানি হানাদাররা তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালায়। তার বড় ভাই জাহাঙ্গীর এখনও পঙ্গু অবস্থায় বেঁচে রয়েছে।’


নিজের জীবনের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার নিজের জীবনের দুটি ঘটনা এখনও মনে পড়ে। একবার আমার মা বর্ডার ক্রস করে দেশের ভেতরে চলে আসে আমাকে দেখার জন্য। মাকে আমি যেখানে থাকি সেখানে না রেখে অন্য গ্রামে এসে থাকার জন্য বলি। রাত ২টার দিকে মাকে দেখতে যাওয়ার জন্য বের হই। ওই গ্রামে যাওয়ার জন্য উজানিসার ব্রিজ পার হতে হয়। ওই ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছিল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন একটি দল। ব্রিজ পার হতে চাইলে নৌকা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। আমরা মাঝির বাড়িতে যাই। গিয়ে দেখি মাঝি প্রচণ্ড জ্বরে কাতর। আমাদের পরিচয় পেয়ে মাঝির বউ ওই রাতে আমাদের ব্রিজ পার করে দেয়।’

‘আর একটা ঘটনা এখনও মনে হয়। যুদ্ধের সময় সীমরাইল গ্রামে ২৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার খাবার নিয়ম ছিল একজনের বাড়িতে। আমার যে বাড়িতে খাওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়িতে গিয়ে দুপুর বেলা খেতে বসেছি। কিছুক্ষণ পর ওই বাড়িতে কান্নার শব্দ শুনি। জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, ওই বাড়ির একটি ১১ বছরের মেয়ে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। তখন খুব কলেরা হত এই দেশে। মেয়েটার মারা যাওয়ার পরও মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় তারা আমার জন্য ভাত রান্না করেছে। সেদিন আমার একইসঙ্গে খুব কষ্ট ও গর্ব হয়েছিল।’