উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা, এ বছর রাণীনগর উপজেলায় ১৮ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই উপজেলার কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান রোপন করা হয়েছে। বোরো আবাদের জন্য উপজেলার মোট ৯২৫হেক্টর জমিতে বোরো বীজতলা তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে কমিউনিটি বীজতলা ৫০০ হেক্টর।
এ বছর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৮টি কমিউনিটি বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। এনএটিপি প্রকল্পের আওতায় ১২০টি সিআইজির (কমন ইন্টারেস্ট গ্রুপ) মধ্যে খট্টেশ্বর রাণীনগর, পারইল, ছয়বাড়িয়া, একডালা, এনায়েতপুর, কুজাইল, বেতগাড়ীসহ মোট ১৮টি ফসল সমবায় কৃষক গ্রুপকে বাছাই করা হয়েছে। এরপর এসব গ্রুপকে কমিউনিটি বীজতলা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
কৃষকরা জানান, আগে তারা ইচ্ছে মতো যেখানে-সেখানে অল্প জায়গায় বীজতলা তৈরি করতেন। বীজতলায় এক সঙ্গে অনেক বীজ ছিটিয়ে দিতেন। প্রাচীন এই পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করতে তাদের অনেক বেশি খরচ হতো। বীজতলার দেখভাল করাও কঠিন হতো। সঠিক পরিচর্যার অভাবে চারার মানও খুব খারাপ হতো। কিন্তু চলতি বছর কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের পরামর্শে এলাকার কৃষকরা একত্রিত হয়ে কমিউনিটি পদ্ধতিতে বড় জায়গায় কমিউনিটি বীজতলা তৈরি করেছেন। এতে তারা উপকৃতও হয়েছেন।
কাশিমপুর ইউনিয়নের চারাপাড়া গ্রামের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘কমিউনিটি বীজতলার জমিতে ১ মিটার প্রশস্ত বেড তৈরি করা হয়। পাশাপাশি দুটি বেডের মাঝখানে ২৫ সেন্টিমিটার নালা রাখা হয়। এরপর বাঁশের লাঠি দিয়ে বেড সমান করা হয়। দুই বেডের মাঝখানের নালা যেমন সেচের কাজে লাগে, তেমনি অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন, সার ও বালাই ব্যবস্থাপনার কাজে লাগে।’ কমিউনিটি বীজতলা পদ্ধতি অনুসরণ করায় এবার প্রচণ্ড শৈতপ্রবাহেও চারার বিশেষ কোনও ক্ষতি হয়নি বরে জানান তিনি।
বেতগাড়ী গ্রামের কৃষক শেখ আমজাদ হোসেন বলেন, ‘বীজতলায় প্রতি বর্গমিটারে ১০০ গ্রাম অঙ্কুরিত বীজ বপন করা হয়। বীজ গজানোর ৪-৫ দিন পর বেডের ওপর ২-৩ সেন্টিমিটার পানি রেখে আগাছা গজানো বাধাগ্রস্ত করা হয়। প্রাচীন পদ্ধতিতে যে জায়গায় ৫০ কেজি বীজ প্রয়োজন হতো সেখানে এখন কমিউনিটি পদ্ধতিতে ৩৫ কেজি বীজ লেগেছে। এতে করে আমার অনেক খরচ বেঁচে গেছে। এই বীজতলার প্রায় সব চারাই স্বাস্থ্যবান, সবল, সতেজ ও রোগমুক্ত। জমিতে এই চারা রোপণ করলে শতকরা ২০ ভাগ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পাবে।’ তিনি জানান, কমিউনিটি বীজতলার যাবতীয় উপকরণ কৃষি অফিস থেকে সরবরাহ করা হয়েছে।
রাণীনগরের কাশিমপুর ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আহসান হাবীব জানান, ‘এই ইউনিয়নের চারাপাড়া গ্রামে পুরুষ সিআইজি সমবায় সমিতি এবং এনায়েতপুর মহিলা সিআইজি সমবায় সমিতির সদস্যদের দিয়ে এককভাবে ১২টি আদর্শ কমিউনিটি বোরো বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমি কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে আসছি।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এসএম গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের এনএটিপি প্রকল্পের আওতায় এই কমিউনিটি বীজতলা তৈরি করা হচ্ছে। কৃষকেরা প্রাচীন যে পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করতেন তাতে বীজ বেশি লাগতো, রোগ-বালাইয়ের আক্রমণও বেশি হতো। কিন্তু কমিউনিটি বীজতলা তৈরি করায় ৫০-৬০ শতাংশ বীজ কম লাগে এবং চারাগুলো স্বাস্থ্যবান, সবল, সতেজ ও রোগমুক্ত হয়। এই পদ্ধতিতে অল্প বয়সের চারা জমিতে রোপণ করা যায়। এতে চারার কুশির সংখ্যা বেশি থাকে এবং ধানের উৎপাদন বেশি হয়। সব মিলিয়ে এই ধরনের উদ্যোগ উপজেলার কৃষি ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। আশা করা যায় আগামী বছরগুলোতে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। আরও বেশি কৃষক এই পদ্ধতি অনুসরণ করবেন।’