পরিসংখানে দেখা যায়, প্রতিবছর ফলদ গাছ লাগানোর হার বাড়ছে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। ফসলি জমিতে লাগানো হচ্ছে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, কলা, পেঁপে, কুল, লেবু, নারিকেল ও সুপারি গাছ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য মতে, রাজশাহী জেলায় ২০১২-১৩ মৌসুমে ফলদ আবাদ হয়েছে ১১ হাজার ৪৪২ হেক্টর, ২০১৩-১৪ মৌসুমে ১৬ হাজার ৪১৮ হেক্টর, ২০১৪-১৫ মৌসুমে ১৯ হাজার ৩০৫ হেক্টর, ২০১৫-১৬ মৌসুমে ২০ হাজার ২৫ হেক্টর, ২০১৬-১৭ মৌসুমে ২৪ হাজার ৫১ হেক্টর এবং ২০১৭-১৮ মৌসুমে ফলদ আবাদ হয়েছে ২৭ হাজার ৬৬১.৫১ হেক্টর জমিতে।
নওগাঁ জেলায় ২০১২-১৩ মৌসুমে ফলদ আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ৪৫০ হেক্টর, ২০১৩-১৪ মৌসুমে ১০ হাজার ৬৫২ হেক্টর, ২০১৪-১৫ মৌসুমে ১০ হাজার ৬৫২ হেক্টর, ২০১৫-১৬ মৌসুমে ১৩ হাজার ২৭১ হেক্টর, ২০১৬-১৭ মৌসুমে ১৪ হাজার ৩৫৪ হেক্টর এবং ২০১৭-১৮ মৌসুমে ফলদ আবাদ হয়েছে ১৫ হাজার ৮৯৩.৫ হেক্টর জমিতে।
নাটোর জেলায় ২০১২-১৩ মৌসুমে ফলদ আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ১৬৭ হেক্টর, ২০১৩-১৪ মৌসুমে ৫ হাজার ২২৬ হেক্টর, ২০১৪-১৫ মৌসুমে ৬ হাজার ৮৫৪ হেক্টর, ২০১৫-১৬ মৌসুমে ৬ হাজার ৮৫৯ হেক্টর, ২০১৬-১৭ মৌসুমে ৬ হাজার ৮৯২ হেক্টর এবং ২০১৭-১৮ মৌসুমে ফলদ আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে।
আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ২০১২-১৩ মৌসুমে ফলদ আবাদ হয়েছে ২৬ হাজার ৫২৩ হেক্টর, ২০১৩-১৪ মৌসুমে ২৭ হাজার ০৪৫ হেক্টর, ২০১৪-১৫ মৌসুমে ২৭ হাজার ১০৪ হেক্টর, ২০১৫-১৬ মৌসুমে ২৭ হাজার ৫৬২ হেক্টর, ২০১৬-১৭ মৌসুমে ২৯ হাজার ৯ হেক্টর এবং ২০১৭-১৮ মৌসুমে ফলদ আবাদ হয়েছে ৩০ হাজার ৩৭২ হেক্টর জমিতে।
সেইসঙ্গে এই চার জেলায় ২০০৯-১০ মৌসুমে বেরো আবাদ হয়েছিল ৪ লাখ ৬ হাজার হেক্টর জমিতে। তা ২০১৭-১৮ মৌসুমে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৬৫ হেক্টর। কম সেচ লাগা আউস ধান চাষাবাদের লক্ষামাত্রা ২০১৮-১৯ মৌসুমে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমি। এর আগে ২০১০-১১ মৌসুমে নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে অর্জিত হয়েছিল ১ লাখ ৭২ হাজার হেক্টর। বৃষ্টিনির্ভর এই ফসল চাষের জন্য ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের বিনামূল্য বীজ ও সার দেওয়া করা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার লাউঘাটা এলাকার আম ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানসহ কয়েকজন মিলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, নওগাঁর সাপাহারে আমবাগান তৈরি করেছেন। মিজানুর রহমান বলেন, ‘চার বছর আগে গোদাগাড়ীর কেশবপুরে ৮০ বিঘা (এক বিঘায় ২৭৫টি করে গাছ) জমিতে আম গাছ লাগানো হয়েছিল। গত বছর অল্প আম পেয়েছিলাম। এবার ২ হাজার মন আম পাওয়ার আশা করছি। এছাড়াও নাচোলে ৩২ বিঘা ও সাপাহারে ৩৪ বিঘা আম্রপালী ও ২৬ বিঘা পেয়ারার গাছ লাগানো হয়েছে। আগে এসব জমিতে ধান চাষ হতো। কিন্তু ধানের চেয়ে আমে লাভ বেশি হওয়ায় আমার মতো অনেকে এখন জমিতে আমবাগান করছে।’
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা খন্দকার মো. মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘একসময় আমরা অপরিকল্পিতভাবে পরিত্যক্ত জায়গায় আম ও লিচু গাছ লাগাতাম। আর এখন বাণিজ্যিকভাবে ফসলি জমিতে আম গাছ লাগানো পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের। কারণ আম, লিচুসহ অনেক ফলজ গাছে তেমন পানি লাগে না।’
জানা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ক্রমাগতভাবে নিচে নামাছে পানি স্তর। ২০১৪ সাল থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলের ৪টি পৌরসভা ও ৩৫ ইউনিয়ানকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরপর এসব ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ৪৮টি কূপ বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি স্তরের নিয়মিত পরিমাপ করে আসছে ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (আইডাব্লুউআরএম)। তাদের তথ্য অনুযায়ী রাজশাহীর তানোরের বাধাইড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের পার্বতীপুর ইউনিয়নে দ্রুত গতিতে পানি নেমে যাচ্ছে। এর পরের স্থানে রয়েছে তানোরের পৌর এলাকা, পাঁচন্দর, ঝিলিম ও নেজামপুর ইউনিয়ন।
এদিকে বাধাইড় ও পার্বতীপুর দুই ইউনিয়ন চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বাধাইড় ইউনিয়নে এক বছরে দুই ফুট পানি নেমেছে। গত বছর মাপ ছিল ১১১ ফুট, এ বছর তা নেমে হয়েছে ১১৩ ফুট। পার্বতীপুর ইউনিয়ন বরেন্দ্রে অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু এলাকা হিসাবে পরিচিত। এ ইউনিয়নে এক বছরের মধ্যে পানির স্তর নেমেছে সাড়ে তিন ফুট নিচে। গত বছর পার্বতীপুর ইউনিয়নে পানির স্তর ছিল ১১৯ ফুট ৫ ইঞ্চি। এ বছর পানির স্তর গিয়ে ঠেকেছে ১২৩ ফুটে। বাকি অঞ্চলগুলোতে নেমেছে ৮ ইঞ্চি থেকে এক ফুট পর্যন্ত। পার্বতীপুর ইউনিয়ন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩৫ ফুট উঁচুতে আর বাধাইড় ইউনিয়ন ১২৫ ফুট।
ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের বরেন্দ্র অঞ্চলের সহকারী প্রজেক্টর জাহাঙ্গীর আলম খাঁন জানান, ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন বন্ধ করে বিকল্প উপায়ের মাধ্যমে সেচ কাজে পানির ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে একসময় কৃষি কাজে সেচ তো দূরের চিন্তা, খাওয়ার মিঠা পানির তীব্র সংকটে পড়বে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু বলেন, ‘সারাদেশেই পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। তবে বরেন্দ্র অঞ্চল বেশি পরিমানে নামছে। তাই ভূগর্ভস্থ থেকে সেচ কাজে পানি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি বরেন্দ্র অঞ্চলে পুকুর-খাড়ি পুনঃখনন করতে হবে। সেচনির্ভর চাষাবাদ বাদ দিয়ে কম পানি লাগে এমন ফসলের দিকে ঝুঁকতে হবে। তা না হলে পরিবেশ বিপর্য ঘটতে পারে।’
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) সদর দফতরের মনিটরিং অফিসার আশরাফুল ইসলাম জানান, বর্তমানে বিএমডিএ কর্তৃক পরিচালিত ১৫ হাজার ৭৯০টি গভীর নলকূপ সেচের মাধ্যমে প্রায় ৩৬ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হচ্ছে। তবে গভীর নলকূপের পানির ব্যবহার কমানোর জন্য বর্তমানে সেচ কাজে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের ওপর ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে মোট ৩ হাজার ৩২টি পুকুর ও ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। বরেন্দ্র এলাকার ভূমি উঁচু-নিচু হওয়ায় পানি সংরক্ষণের জন্য খালে ৬৯৬টি ক্রসড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও সেচ কার্যক্রমে নদীর পানি ব্যবহারের লক্ষ্যে গোদাগাড়ীতে পদ্মানদী থেকে ২টি স্থাপনা থেকে ৪৮ কিউসেক পানি উত্তোলন করে ৩.৫ কিলোমিটার দূরত্বে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ গোদাগাড়ী উপজেলার সরমংলা খালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। খাল থেকে বিভিন্ন স্থানে পাম্পের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বছরব্যাপী সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও পদ্মা, মহানন্দা ও আত্রাই নদী থেকে পাম্পের সাহায্যে পানি উত্তোলন করে সরাসরি জমিতে সেচ দেওয়ার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বোরো ধান উৎপাদনে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। তাই সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমানোর জন্য বোরো ধানের পরিবর্তে শস্য বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে সেচের পানি কম ব্যবহার করে অধিক লাভজনক ফসল (গম, আলু, সরিষা, ডাল ইত্যাদি) চাষের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে করে বোরো ধান চাষ হ্রাস ও অন্য ফসল ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে ২০ শতাংশ পানি সাশ্রয় হয়।’
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর অধিকাংশ এলাকা এবং নাটোরসহ বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও পাবনার অধিকাংশ এলাকা নিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চল। বিগত দিনে এখানকার কৃষিকাজ বৃষ্টিনির্ভর ছিল। তাই বছরে একটি ফসল উৎপন্ন হতো। যথাসময়ে বৃষ্টি না হলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হতো। তাই মাটির গঠন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের কারণে এসব অঞ্চলে প্রচলিত গভীর নলকূপ দিয়ে সেচ দেওয়া সম্ভব ছিল না। ১৯৮৫ সালে এ অঞ্চলের তৎকালীন বিএডিসির প্রকৌশলীরা এক ধরনের গভীর নলকূপ উদ্ভাবন করেন। তখন থেকে ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে সেচের কার্যক্রম চলে আসছে এ অঞ্চলে।
আরও পড়ুন- পদ্মার চরে চাষাবাদ, সবুজ দেখতে ভিড়