রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় মুকুল সরেন (৩৫) নামে এক কৃষক কীটনাশক পানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এই কৃষকের দাবি, বোরো চাষের জমিতে সেচের পানি না পেয়ে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।
গত রবিবার (৯ এপ্রিল) বিকালে বিষপান করেন এই কৃষক। এরপর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক। মুকুল সরেনের বাড়ি দেওপাড়া ইউনিয়নের বর্ষাপাড়া গ্রামে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এখন কথা বলতে পারছেন।
গত বছরের মার্চে একই উপজেলার নিমঘটু গ্রামের বাসিন্দা অভিনাথ মার্ডি ও তার চাচাতো ভাই রবি মার্ডি সেচের পানি না পেয়ে কীটনাশক পানে আত্মহত্যা করেন। এবার আরেক কৃষক বিষপান করায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। এ কারণে মুকুল সরেনের বিষপানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে তদন্ত কমিটির দাবি, মুকুল সরেন সেচের পানি না পেয়ে বিষপান করেননি। অন্য কোনও কারণে করেছেন।
দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়ায় এই কৃষকের বিষপানের কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিলে সঠিক কারণ জানা যাবে।
মুকুল সরেন জানিয়েছেন, সাড়ে তিন বিঘা বোরো ধানের জমিতে সেচের পানি না পেয়ে বিষপান করেছেন। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এদিকে, মুকুল সরেনের বিষপানের দুটি কারণ উদ্ঘাটন করেছে বলে দাবি করেছে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে একটি হলো কয়েক মাস আগে মুকুল সরেনের স্ত্রী তাকে ছেড়ে বাবার বাড়ি চলে গেছেন। বাড়িতে সন্তানদের নিয়ে সমস্যার মধ্যে ছিলেন মুকুল। আরেকটি হলো গত বছর দুই কৃষকের বিষপানের ঘটনায় চাকরিচ্যুত গভীর নলকূপ অপারেটরের হাত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে কমিটি।
তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কৃষক মুকুল সরেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘টানা ছয়-সাত দিন ধরে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) গভীর নলকূপে ঘুরেও সেচের পানি পাইনি। নলকূপের পাইপ ফুটো হয়েছে বলে অপারেটর হাসেম আলী সব কৃষকের কাছ থেকে ৮০ টাকা করে তুলছিলেন। মঙ্গলবার আমিও টাকা দিতে চেয়েছি। এর আগে ধান বাঁচাতে সেচের পানি চেয়েছিলাম। কিন্তু হাসেম আমার ক্ষেতে পানি দেননি। তাই বিষপান করেছি।’
মুকুল সাংবাদিকদের জানান, গত রবিবার দুপুরে হাসেম আলীর সঙ্গে কথা-কাটাকাটির পর তিনি বিষপান করেন। বিষপানের পর হাসেম আলী তার জমিতে ১৫ মিনিট সেচ দিয়েছেন। মুকুলের বিষপানের খবর শুনে সোমবার রাতে তাকে দেখতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ। জেলা প্রশাসকের কাছে একই অভিযোগ করেন মুকুল। তখন সুস্থ হওয়ার পর মুকুলকে তার কার্যালয়ে ডাকেন এবং সব সমস্যা সমাধান করে দেওয়ার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক। মুকুলকে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে কোনও সমস্যা হলে কল করারও পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ বলেন, ‘ওই কৃষককে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম। ওই সময় কৃষক এবং তার পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, সেচের পানি না পাওয়ায় আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বাধীন কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। মুকুলের চিকিৎসার সব খরচ বহন করবে জেলা প্রশাসন।’
মঙ্গলবার দুপুরে তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঈশ্বরীপুর গ্রামে গিয়ে ঘটনার তদন্ত করেন। এ সময় বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক আবদুর রশীদ, গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলামসহ বিএমডিএর অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা অপারেটর হাসেম এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন।
এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান ইউএনও সঞ্জয় কুমার মহন্ত বলেন, ‘মাঠে গিয়ে দেখলাম সব কৃষকের জমিতে পানি আছে। মুকুল সরেনের জমিতেও পানি আছে। এই কৃষক ছাড়া কেউ আমাদের বলেননি পানি পেতে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এ জন্য সেচের পানির জন্য মুকুল বিষপান করেছেন, এটা মনে হচ্ছে না। এর পেছনে অন্য কোনও কারণ থাকতে পারে।’
ইউএনও সঞ্জয় কুমার মহন্ত আরও বলেন, ‘তদন্তকালে প্রাথমিকভাবে দুটি কারণ দেখতে পাচ্ছি আমরা। একটি হলো সন্তানদের রেখে মুকুলের স্ত্রী কয়েক মাস আগে বাবার বাড়ি চলে গেছেন। এ ছাড়া গত বছর দুই কৃষক বিষপানে মারা যাওয়ার পর চাকরিচ্যুত অপারেটরের এ ঘটনায় যোগসূত্র থাকতে পারে। ঘটনার দিন মুকুলের অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গেও কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এসব বিষয় তুলে ধরে আজই জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন দেবো আমরা।’
বর্ষাপাড়া গ্রামের পাশের গ্রাম নিমঘটু। গত বছরের মার্চে বোরো ধানের জমিতে পানি না পেয়ে নিমঘটু গ্রামের কৃষক অভিনাথ ও তার চাচাতো ভাই রবি বিষপান করেন। এতে তাদের মৃত্যু হলে তোলপাড় শুরু হয়। ওই দুই কৃষক বিএমডিএর যে গভীর নলকূপের আওতায় জমি চাষ করতেন, সেই একই নলকূপের কৃষক মুকুল সরেন। দুই কৃষকের মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে তৎকালীন গভীর নলকূপ অপারেটর সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ওই ঘটনার শুরু থেকে বিভিন্ন পক্ষ ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। বিষ নয়, মদপানে মৃত্যু হয়েছে বলেও তখন প্রচারণা চালানো হয়েছিল। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, বিষপানে তাদের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। ওই সময় চাকরিচ্যুত হন সাখাওয়াত। পরে নিয়োগ পান বর্তমান অপারেটর হাসেম আলী।
এ বিষয়ে বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক আবদুর রশীদ বলেন, ‘মুকুল সরেন সেচের পানির জন্য বিষপান করেছেন বলে মনে হচ্ছে না। এর পেছনে অন্য কারণ আছে। আমরা সেটি তদন্ত করে দেখবো।’