ল্যাংড়া, ফজলি, গোপাল ভোগ, খিরসাপাত, মোহনভোগসহ বিভিন্ন জাতের আমের ফলন হয় এখানে। আর মুকুল ধরে রাখতে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ছিটিয়ে গাছের বাড়তি যত্ন নিচ্ছেন চাষিরা। যত বেশি মুকুল রক্ষা করা যাবে আমের ফলন তত বেশি হবে। তবে ফলন ভালো করতে মুকুল ও গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করলেও উদ্বিগ্ন আম চাষিরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, পর পর গত দু’বছর জেলায় প্রচুর আম উৎপাদন হলেও বাজারজাতকরণে প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতায় ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছিলো তাদের। তারা বলছেন, গত বছর গাছ থেকে আম নামানোর সময়সীমা বেঁধে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। এতে চরমভাবে আর্থিক ক্ষতির শিকার হন আম চাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা। আর এই সুযোগে দেশীয় আম নামানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ভারত থেকে আম আমদানি করেছিল। এতে দেশীয় ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আর অনাকাঙ্ক্ষিত এ পরিস্থিতিতে এবারও যেন আম চাষি ও ব্যবসায়ীদের পড়তে না হয়, এমন সিদ্ধান্ত না নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন, জেলার আম চাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ী এবং সংগঠনের নেতারা।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জেলায় আম মৌসুমে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার আমের ব্যবসা হয় এবং ৬ মাসে ২ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর বাগান মালিকরা তাদের বিক্রিত আমবাগানের টাকা দিয়ে সংসারসহ বাড়তি খরচ করে থাকে। ইতোমধ্যে জেলার সর্ববৃহৎ আমের বাজার কানসাট আম ব্যবসায়ী সমিতি, ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশন, চেম্বার অব কমার্স, ম্যাংগো প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন চলতি বছরে আম ভাঙার সময় বেঁধে দেওয়ার ব্যাপারে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা এবং প্রশাসনের অহেতুক হয়রানি বন্ধে বিভিন্ন ফোরামে জোরালো দাবি তুলেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানান, প্রাকৃতিকভাবে আম পেকে থাকে, কিন্তু গতবার জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পোক্ত আম পাড়ার সময় বেঁধে দেওয়ায় অনেক আমচাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবছর এ সিদ্ধান্তটি বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন তিনি।
নবাগত জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম জনান, জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল আম । এ আম নিয়ে অনেকেই গত বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। তাই এবার জেলা আম পরিবীক্ষণ কমিটির সামনের সভায় আমব্যবসায়ীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুমিষ্ট আম নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। চলতি বছরে যাতে আমচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য তাদের পক্ষ থেকে কৃষিমন্ত্রী, এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন ফোরামে যোগাযোগ শুরু করেছেন।
ম্যাংগো প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনিরুল ইসলাম বলেন, গত বছরের আম মৌসুমে জেলা প্রশাসনের একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালালেও, কোথাও ফরমালিন বা কার্বাইড মিশ্রিত আম জব্দ করতে পারেনি। তারপরও ফরমালিন আতঙ্কে ভোক্তাদের আমের ব্যাপারে অনাগ্রহ তৈরি হওয়ায় এ জেলার আমব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
কানসাট আম আড়তদার ব্যবসায়ী সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী এমদাদুল হক জানান, প্রতিবছর এসময় বাগান ২/৩ বার হাত বদল হয়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত একবারও বিক্রি না হওয়ায় বাগানমালিকরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
নবাবগঞ্জ আম ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সেরাজুল ইসলাম জানান, এ জেলার অহংকার হচ্ছে আম। আর এখানকার আমচাষীরা বরাবরই ফরমালিন বা কার্বাইড মিশ্রিত করে না। তারা সৎভাবে যুগযুগ ধরে আম ব্যবসা করে আসছে। অথচ একটি মহলের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে গত বছর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা আমচাষীদের লোকসান গুনতে হয়। এ কারণেই চলতি বছর এখন পর্যন্ত অধিকাংশ আমবাগান বেচাকেনা না হওয়ায় এখানকার মানুষজন আর্থিকভাবে ভালো নেই। এমনকি আম নিয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সাজদার রহমান জানান, এবছর আমের অফ এয়ার হওয়া সত্ত্বেও, বাগানগুলোতে মুকুলে মুকুলে ছেয়ে গেছে। জেলার ৫টি উপজেলার ২৪ হাজার ৪শ ৬০ হেক্টর জমিতে ১৮ লক্ষ ৫৮ হাজার ৭শ’ ৭০ টি গাছ রয়েছে। এবার ২ লক্ষ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন প্রতিটি বাগানে আমচাষীরা মুকুলে যাতে ছত্রাক জাতীয় রোগে আক্রান্ত না হয়, সেজন্য কীটনাশক স্প্রে করে গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছে। জানুয়ারি মাসে ১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়াসহ এ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমের উৎপাদন এবারও বাম্পার হবে বলেই মনে করছেন কৃষি বিভাগ।
/টিএন/আপ-এনএস/