প্রতিমন্ত্রীর এলাকায় ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে নিয়োগের ফলাফল স্থগিত

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুলের এলাকাসহ নাটোরের চারটি উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের শুমারির নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের আদেশে এসব উপজেলার ফলাফল স্থগিত করা হয়। 

এর আগে বুধবার লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কার্যালয় ঘেরাও করে ভাঙচুর চালায় যুবদল ও ছাত্রদল। মারধর করে ছিনিয়ে নেওয়া হয় সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা। তারই প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ফলাফল স্থগিত করার আদেশ এলো। 

আদেশে বলা হয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশে নাটোরের লালপুর, বাগাতিপাড়া, বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল স্থগিত করা হলো। এর মধ্যে লালপুর ও বাগাতিপাড়া প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের নির্বাচনি এলাকা। এই দুই উপজেলায় দুই ইউএনওকে অবরুদ্ধ করে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক সৈয়দ মোস্তাক হাসান স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়, ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬ বাস্তবায়নে নাটোরের বাগাতিপাড়া, লালপুর, বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলার জন্য তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে জনবল নিয়োজিতকরণের লক্ষ্যে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। ওই ফলাফল স্থগিতকরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিয়েছেন। এ অবস্থায় ফলাফল স্থগিতকরণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।

এর আগে বুধবার সকালে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের জন্য সুপারভাইজার ও কর্মী নিয়োগ পরীক্ষার ফল ঘোষণা করা হয়। সেখানে আওয়ামী লীগের লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ তোলেন যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে প্রতিবাদ জানিয়ে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করেন। বাগাতিপাড়ার মালঞ্চি রেলগেট এলাকা থেকে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানার নেতৃত্বে মিছিলটি ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। সেখানে গিয়ে ইউএনওর বিরুদ্ধে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

একপর্যায়ে সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে বিক্ষোভকারীরা ইউএনওর কক্ষের সামনে ভাঙচুর করে ইউএনওকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ সময় ঘটনার ছবি-ভিডিও ধারণ করলে অন্তত পাঁচ জন সাংবাদিককে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়। তাদের ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ছবি-ভিডিও মুছে দেওয়া হয়। তবে ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকলেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি সাংবাদিকদের মারধর করলেও কোনও রকম বাধা দেয়নি পুলিশ। 

স্থানীয় দুজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, ঘটনার তথ্য সংগ্রহ এবং ভাঙচুরের ছবি-ভিডিও ধারণ করার সময় স্টার নিউজের জেলা প্রতিনিধি তারিকুল ইসলাম, এনটিভি অনলাইনের প্রতিনিধি সজিবুল ইসলাম, ঢাকা পোস্টের প্রতিনিধি আশিকুর রহমান, দৈনিক মানবজমিনের প্রতিনিধি রাশিদুল ইসলাম ও নেক্সাস টেলিভিশনের প্রতিনিধি শরিফুল ইসলামসহ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে মারধর করেছেন যুবদল-ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

অন্যদিকে লালপুর ইউএনও কার্যালয় সূত্র জানায়, দুপুর ১২টার দিকে ৪০ থেকে ৫০ জন মিছিল করতে করতে কার্যালয়ের সামনে আসেন। তারা ইউএনওর গাড়ি ঘিরে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে তারা মিছিল নিয়ে দোতলায় ইউএনও কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন। এ সময় উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ, বিএনপি সমর্থিত বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান, গোপালপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম, ঈশ্বরদী ইউপির চেয়ারম্যান মো. রঞ্জুসহ নেতাকর্মীরা বিক্ষোভকারীদের দাবিদাওয়া নিয়ে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলেন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা উপজেলা পরিষদের হলরুমে ও ইউএনও নিজ কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন।

লালপুর ও বাগাতিপাড়ার দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, সরকারি নিয়মনীতি মেনেই মেধার ভিত্তিতে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ ফলাফল নিয়ে একটা পক্ষ তাদের কক্ষ ভাঙচুর করেছে, তাদের লঞ্ছিত করেছে।

নাটোর জেলা সমাজসেবা পরিচালক নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশে চারটি উপজেলার নিয়োগের ফল স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা পেলে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।’

এ ব্যাপারে জানতে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুলের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও না ধরায় এ ব্যাপারে তার কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।