ভ্যান করে পাট নিয়ে হাটে যাচ্ছিলেন কৃষক আবুল মিয়া। ভাঙা সড়কের খাদে পড়ে পাটগুলো ময়লা পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। ভেঙে যায় ভ্যানও। গত শুক্রবার ভোরের অন্ধকারে কষ্টের ফসল পাট নিয়ে হাটে যাওয়ার সময় নাটোরের বড়াইগ্রামের নওয়াদোজোয়াড়ি এলাকায় ঘটনাটি ঘটে।
তিনি নওয়াদোজোয়াড়ি গ্রামের বাসিন্দা। সেদিন দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর পাটগুলো উদ্ধার করে বাড়ি ফেরার পথে আবুল মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে জানালেন, পাট বিক্রির টাকায় বাজার করার কথা ছিল। বাজার করা তো দূরের কথা- পথে ভ্যান উল্টে পাট নষ্ট হওয়ায় টাকা ধার নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। সঙ্গে বুকভরা কষ্টও ছিল। ভাঙা এই সড়কটিতে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সড়কটি মেরামত করছে না।
শুধু আবুল মিয়া নন, তার মতো হাজারে মানুষজন সড়কটিতে চলাচল করতে গিয়ে নিদারুণ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। গত প্রায় এক দশক ধরে চলছে এমন পরিস্থিতি।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্যমতে, রাজ্জাক মোড় থেকে শুরু হয়ে গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলার সীমান্ত হয়ে নাটোর সদর উপজেলার আহমেদপুর বাজারের মহাসড়কে গিয়ে শেষ হয়েছে ১০ কিলোমিটারের এই পাকা সড়কটি। এর মধ্যে বড়াইগ্রামের মৌখাড়া হাট থেকে আহম্মেদপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়ক একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জামাল উদ্দিন মণ্ডল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মৌখাড়া হাট আর বনপাড়া-নাটোর মহাসড়কের ফলে সড়কটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলার বহু মানুষ মৌখাড়া হাট ও নাটোর সদরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সড়কটি ব্যবহার করে। অথচ জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কের ভাঙাচোরা তিন কিলোমিটার অংশ বিগত ১০ বছরেও মেরামত করেনি নাটোর সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এতে সড়কের ওপর নির্ভরশীল মানুষের প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সড়কের নওয়াদোজোয়াড়ি কালভার্ট থেকে আলীপুর মাদ্রাসা পর্যন্ত ভাঙাচোরা আর ছোটবড় গর্তে ভরা। বৃষ্টি হওয়ায় সেসব গর্ত পানিতে ডুবে একাকার হয়ে গেছে। প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই সড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙা। না সড়কে চলাচল করতে গিয়ে মোটরসাইকেল, পন্যবাহী ছোটবড় যানবাহন উল্টে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ট্রাকের চাকা আটকে পুরো সড়ক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবু ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন স্থানীয় লোকজন।
স্থানীয় মৌখাড়া ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ লুৎফর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি কলেজ, আলিম মাদ্রাসা, তিনটি উচ্চ বিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী ভাঙাচোরা এই সড়ক পেরিয়ে দুর্ভোগ সয়ে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু গুরুত্ব বিবেচনায় সড়কটি মেরামত করা হয়নি। সড়কটির ভাঙা অংশ দ্রুত মেরামতের দাবি জানাচ্ছি।’
স্থানীয় মানিক, ছাবিরুল, খলিল সরকার, নয়ন মণ্ডলসহ অন্তত ১০ জন কৃষক বাংলা ট্রিবিউনকে আক্ষেপ করে বলেন, গরু-ছাগল থেকে শুরু করে কৃষকের উৎপাদিত সব ধরনের ফসল মৌখাড়া হাটে বিক্রি করা হয়। ভাঙা সড়ক বয়ে কৃষিপণ্যগুলো সময় মতো বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। আবার সার-বীজ পরিবহনের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়। সবশেষ ১০ বছর আগের পাকা করা সড়কটি ক্রমশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে কাদা-পানিতে ডুবে থাকছে। অথচ এই লম্বা সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন সড়কটি মেরামত করেনি সেই প্রশ্ন তাদের।
মৌখাড়া হাটের ইজারাদার আবদুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গুরুদাসপুরের চাপিলা, বড়াইগ্রামের জুয়াড়ি ইউনিয়ন ও নাটোরের আহম্মেদপুর এলাকার কয়েক হাজার মানুষ ভাঙা সড়ক বয়ে সপ্তাহের শুক্রবার এই হাটে আসেন। আশপাশের বড় হাট হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হাটটির ওপর প্রত্যক্ষ এবং পরক্ষ্যভাবে নির্ভরশীল। কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয় এই হাটে। কিন্তু ভাঙাচোরা সড়ক বয়ে হাটে পণ্য আনা নেওয়া ব্যাপক কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে ওঠে। একই সময়ে অন্য সড়কগুলো একাধিকবার মেরামত করা হয়েছে। কিন্তু গত ১০ বছরে সড়কটি একটিবারও কেন মেরামত করা হয়নি এটি আমার প্রশ্ন।’
এ ব্যাপারে নাটোর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান সরকার বলেন, ‘সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ। সাড়ে তিন কিলোমিটারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গুরুত্ব বিবেচনায় ভাঙা অংশ আরসিসি ঢালাই করার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। ভোগান্তি লাঘবে স্বপ্ল সময়ের মধ্যেই মেরামত করা হবে।’