‘এই যে আমাকে সাজা দিলো। দুর্নীতি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে আপনাদের ধারণা আছে? আমার বিরুদ্ধে মামলা দিলো। চার জনের সাক্ষীতে যদি আমাকে যাবজ্জীবন জেল দেয়, তাহলে এখানে কয়েক হাজার লোক আছে, এরা তো সাক্ষ্য দিচ্ছে প্রতিপক্ষরা কী কী করেছে। বিচার হবে। বিচার কিন্তু শুরু হয়েছে। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি এই নাজিরপুরের মাটিতেই বিচার হবে তাদের।’
নাটোরের গুরুদাসপুরে ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি প্রধান শিক্ষক ফিরোজুল ইসলাম (৪৮) আপিলে জামিনে বেরিয়ে এসে এমন হুমকি দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন।
এসএসসি পরীক্ষার্থীকে (১৫) বিদ্যালয় থেকে অপহরণের পর আটকে রেখে ধর্ষণের মামলায় ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজকে যাবজ্জীবনসহ দুই মেয়াদে সাজা দিয়েছিলেন আদালত। উচ্চ আদলতের আদেশে মঙ্গলবার রাতে রাজশাহী কারাগার থেকে জামিনে মুক্তির পর স্থানীয় লোকজন নিয়ে গুরুদাসপুরের নাজিরপুরে সভা করেন তিনি। সেখানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ফিরোজ এ হুমকি দেন।
কাদের উদ্দেশ্য করে এমন হুমকিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন, তা উল্লেখ করেননি তিনি। তবে লোক মাধ্যমে ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা মামলার বাদীকে এরই মধ্যে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন।
মামলার বাদী বলেন, ‘জামিনে এসেই আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। নাজিরপুরের মাটিতেই বিচার করার হুমকিও দিয়েছে। এতে পরিবার নিয়ে আতঙ্কে বসবাস করছি। বিষয়টি আমি থানা পুলিশকে জানিয়েছি।’
দণ্ডপ্রাপ্ত ফিরোজুল ইসলাম গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি নাজিরপুরের দৌলতপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে। গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন। একই বিদ্যালয়ের ছাত্রীকে অপহরণের পর আটকে রেখে ধর্ষণ করেছিলেন। সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেছিলেন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় পৃথক দুটি ধারায় গত বছরের ১১ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মলহিদুজ্জামান মুহিত।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দুই শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে রাজশাহী কারাগারের মূল ফটক থেকে ফুলের মালা দিয়ে ফিরোজকে বরণ করেন তার সমর্থকেরা। পরে রাতে নাজিরপুর এলাকায় কয়েকশ লোকের উপস্থিতিতে একটি সমাবেশ করেন তিনি। সমাবেশের বক্তৃতায় বিভিন্ন ধরনের কথা বলেন। বক্তব্যের ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে নানা সমালোচনা শুরু হয়।
আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজা, আপিলে জামিন
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি মুন্সি আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষক ফিরোজের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যাবজ্জীবন এবং অপহরণের ঘটনায় পৃথক একটি ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। নির্যাতিত শিক্ষার্থীর পরিবার আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট হয়েছিল। কিন্তু আপিলে আসামি ফিরোজ জামিন পাওয়ায় বাদীর পরিবারে ভীতি তৈরি হয়েছে।
ওই ছাত্রীর বাবা বলেন, ‘মামলা দায়ের করার পর থেকে রায় আজ পর্যন্ত তিন বছরে বিভিন্ন সময়ে ফিরোজ লোকজন নিয়ে নানাভাবে হুমকি দিয়েছেন। টাকার লোভ দেখিয়ে আপস করতে চেয়েছেন। কিন্তু মেয়ের ও পরিবারের সম্মানের কথা চিন্তা করে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে মামলা চালিয়েছি। রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ে সন্তুষ্ট হয়েছিলাম। কিন্তু ১১ মাস জেল খাটার পর আপিল বিভাগে গিয়ে জামিন পেয়েছেন আসামি। বেরিয়ে এসে বিচার করার হুমকি দিয়েছেন। এখন চরমভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি আমরা।’
মামলার নথিতে যা আছে
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, গুরুদাসপুর উপজেলার একটি গ্রামের ওই ছাত্রী নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেন। ২০২২ সালের ১ অক্টোবর এসএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে এলে বিদ্যালয়ের ফটকের সামনে থেকে সেখানকার প্রধান শিক্ষক প্রকাশ্যে ওই ছাত্রীকে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যান। একপর্যায়ে রাজশাহীর একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে ওই ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে ফিরোজ ও তার দুই ভাইকে আসামি করে গুরুদাসপুর থানায় ধর্ষণ মামলা করেন। ওই বছরের ১১ অক্টোবর রাত সোয়া ১২টার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার তকীতলার একটি আবাসিক হোটেল থেকে অভিযুক্ত ওই প্রধান শিক্ষককে গ্রেফতার করেছিল র্যাব-৫।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি মুন্সি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণার তারিখ ছিল। এর আগে ২৭ নভেম্বর ধার্য তারিখে হাজিরা দিতে গেলে আদালত ফিরোজের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং ধর্ষণের ভিডিওতে প্রধান শিক্ষক ফিরোজের বিরুদ্ধে দুটি অপরাধ প্রমাণিত হয়। এ সময় অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করে ধর্ষণের ধারায় যাবজ্জীবন ও অপহরণের অপর একটি ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন বিচারক। পরে ফিরোজকে কারাগারে নিয়ে যায় পুলিশ। এ সময় খালাস দেওয়া হয় অপর দুই আসামিকে।
হুমকির বিষয়ে যা বলছে পুলিশ
গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নান বলেন, ‘ধর্ষণ মামলার বাদীকে অন্যায়ভাবে হুমকি দেওয়া হলে অভিযোগ সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’