যে বিরোধে সরকারদলীয় এমপির ওপর হামলা করলো স্থানীয়রা

সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ) আসনের সংসদ সদস্য আয়নুল হকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় তার গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। তবে সংসদ সদস্য আয়নুল আঘাতপ্রাপ্ত হননি। শনিবার (১৫ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার দিকে রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া বাজার এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।

হামলার ঘটনায় জামায়াত ও এনসিপির নেতাকর্মীরা জড়িত বলে দাবি করেছেন এমপি। তবে রায়গঞ্জে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) কোথায় স্থাপন করা হবে—এ নিয়ে ধানগড়া ও চান্দাইকোনা এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরেই এমপির ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিকালে রায়গঞ্জের ধানগড়া এলাকায় টিটিসি স্থাপন নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে সংসদ সদস্য আইনুল হকের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ধানগড়া ও চান্দাইকোনা এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এ নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে সভাস্থলের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রায়গঞ্জে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই এর স্থান নির্ধারণ নিয়ে দুই এলাকার মানুষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। ধানগড়াবাসীর দাবি, টিটিসি পৌরসভা এলাকায় স্থাপন করতে হবে। অন্যদিকে চান্দাইকোনার বাসিন্দারা তাদের এলাকায় টিটিসি স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ চলছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার বিকালে ধানগড়া বাজারে বিষয়টি নিয়ে জরুরি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় দুই পক্ষের বক্তব্যের সময় উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে সংসদ সদস্য আইনুল হক সভাস্থল ত্যাগ করে গাড়িতে ওঠেন। তিনি গাড়ি নিয়ে এলাকা ছাড়ার সময় কয়েকজন ব্যক্তি তার গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হামলায় সংসদ সদস্য আয়নুল হক আঘাতপ্রাপ্ত হননি। তবে তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন। ইটপাটকেল নিক্ষেপের কারণে এমপির ব্যবহৃত গাড়ির গ্লাস ভেঙে গেছে।

ঘটনার পর এ নিয়ে ভিডিওবার্তা দিয়ে সংসদ সদস্য আয়নুল হক বলেন, ‘আমার ওপর হামলা করা হয়েছে। আমি একজন সরকারদলীয় এমপি হয়েও নিরাপদ নই। আমাদের জীবনের ও জানমালের নিরাপত্তা নেই। এনসিপি ও শিবিরের লোকজন আমার ওপর হামলা করেছে। আমি দ্রুত এই সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।’

জেলা বিএনপির সহ-প্রচার সম্পাদক ও ধানগড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উপজেলায় কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয় নিয়ে আজ ধানগড়া বাজারে জরুরি মতবিনিময় সভা ছিল। সভাস্থলেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমি শহরে থাকায় সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। একটু আগে বিষয়টি জানার পর রায়গঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়েছি।’

তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে জামায়াতে ইসলামী। সিরাজগঞ্জ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক জাহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণে তারা নিজেরাই নিজেদের গাড়ি ভাঙচুর করে এর দায় জামায়াতে নেতাকর্মীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। এ ঘটনার সঙ্গে জামায়াতের কোনও সম্পৃক্ততা নেই। আমরা এ ধরনের নোংরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।’

একই কথা বলেছেন রায়গঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির আলী মর্তুজা। তিনি বলেন, ‘বিএনপির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গ্রুপিংয়ের কারণে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং জামায়াতকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়ানো হচ্ছে। এখানে জামায়াতের কোনও নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতা নেই।’

এদিকে ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিলে পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ বিষয়ে রায়গঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে বিশৃঙ্খলা হয়েছিল। ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ তৎপর আছে। তবে এ ঘটনায় এখনও কোনও পক্ষ মামলা কিংবা লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, টিটিসি স্থাপনের স্থান নির্ধারণ নিয়ে দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধের সমাধান না হওয়ায় মতবিনিময় সভায় উত্তেজনা তৈরি হয়। আর সেই উত্তেজনাই শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্যের গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় রূপ নেয়। এখানে জামায়াত-এনসিপির সংশ্লিষ্টতা নেই।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হামলায় এমপি আঘাতপ্রাপ্ত হননি। তবে তার গাড়ির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। যারা হামলা করেছে তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’