জর্দার কৌটায় শেষ ১০ বছরের সঞ্চয়!

স্বামী মারা গেছেন তিন মাস আগে। সংসারে অভাব, নেই নিয়মিত আয়। দুই মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন অনেক কষ্টে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্বামীর সঙ্গে প্রায় ১০ বছর ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছিলেন মনোয়ারা বেগম। সেই সঞ্চয় একসময় দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ টাকায়। নিরাপদ ভেবে টাকাগুলো তুলে রেখেছিলেন একটি জর্দার কৌটায়।

কিন্তু বিপদের দিনে সেই কৌটাই হয়ে উঠলো সর্বনাশের কারণ।

প্রয়োজনের সময় কৌটাটি খুলে টাকা বের করতে গিয়ে মনোয়ারা দেখলেন, তার ১০ বছরের কষ্টের সঞ্চয় আর টাকা নেই—ঝাঁঝরা হয়ে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। হাতে নেওয়ার মতো অবস্থাতেও নেই সেই ২ লাখ টাকা।

শেষ সম্বল হারিয়ে এখন অনেকটা নিঃস্ব মনোয়ারা।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকালে শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা রোডসংলগ্ন এলাকায় মনোয়ারা বেগমের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় হারানোর কথা বলতে বলতে একসময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এই টাকাডা আছিল আমার শেষ সম্বল। স্বামী নাই, কামকাজও নাই। মেয়েগো বিয়া দিছি অনেক কষ্টে। দশ বছর ধরে একটু একটু কইরা টাকা জমাইছি। ভাবছিলাম, বিপদের সময় এই টাকাডা কাজে লাগামু। অহন সব শেষ হইয়া গেল। অহন আমি কী করমু?’

কথাগুলো বলতে বলতে ভারী হয়ে আসে তার কণ্ঠ। কিছুক্ষণ পর আবার বলেন, ‘ভোগাই নদী থাইকা আগে বালু-পাথর তুইলা বিক্রি কইরা সংসার চালাইতাম। অহন নদীতে পাথরও নাই। স্বামীও নাই। শেষ সম্বলটাও নষ্ট হইয়া গেল। আল্লাহ আমার আর কী রাখছে, জানি না।’

ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, মনোয়ারা বেগম ভোগাই নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করতেন। তার স্বামী জিয়া উদ্দীন ছিলেন মিষ্টি তৈরির কারিগর। দুজনের কষ্টের উপার্জনেই চলত সংসার। সেই আয় থেকে অনেক কষ্টে দুই মেয়ের বিয়ে দেন তারা।

সংসারের খরচ মেটানোর পর ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রায় ১০ বছর ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমাতেন তারা। খুচরা টাকা জমিয়ে পরে এক হাজার টাকার নোট সংগ্রহ করতেন। এভাবেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সঞ্চয়। প্রায় আট মাস আগে সেই সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ টাকা।

টাকাগুলো নিরাপদে রাখার জন্য একটি জর্দার কৌটায় তুলে রাখেন মনোয়ারা। তখন কে জানতো, সেই কৌটাতেই একদিন শেষ হয়ে যাবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সঞ্চয়!

এরপর প্রায় তিন মাস আগে মারা যান স্বামী জিয়া উদ্দীন। স্বামীর মৃত্যুর পর মনোয়ারার সংসারে নেমে আসে আরও কঠিন সময়। যে ভোগাই নদী থেকে বালু-পাথর তুলে তারা সংসার চালাতেন, সেখানেও এখন আগের মতো পাথর নেই। ফলে সেই কাজ থেকেও আয় বন্ধ হয়ে গেছে।

সম্প্রতি টাকার প্রয়োজন হলে সেই জর্দার কৌটাটি বের করেন মনোয়ারা। কিন্তু কৌটার মুখ কোনওভাবেই খুলতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে কৌটার মুখ কেটে টাকা বের করেন তিনি।

আর তখনই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভয়াবহ দৃশ্য।

কৌটার ভেতরে থাকা ২ লাখ টাকার নোটগুলো ঝাঁঝরা হয়ে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের যত্নে জমানো সেই টাকা এখন আর ব্যবহার করার মতো নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা মিলন শেখ বলেন, মনোয়ারা ও তার স্বামী জিয়া দুজনই খুব কষ্ট করে সংসার চালাইতেন। জিয়ার মৃত্যুর পর অভাবের সংসারে টাকা নষ্ট হওয়ার কথা শুনে সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছি। তাদের বাসায়ও গিয়েছিলাম। মনোয়ারা এখন শুধু কাঁদেন।

প্রতিবেশী সাদ আল জুনায়েদ বলেন, দীর্ঘদিন কষ্ট করে সঞ্চয় করা এই টাকা মনোয়ারা বেগমের কাছে শুধু অর্থ ছিল না; ছিল স্বামীর মৃত্যুর পর বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। সেই সঞ্চয় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

একদিকে স্বামী হারানোর শোক, অপরদিকে জীবিকার পথ বন্ধ। তার ওপর ১০ বছরের কষ্টে জমানো ২ লাখ টাকা হারিয়ে এখন শূন্য হাতে মনোয়ারা। যে কৌটায় ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ভেবেছিলেন, সেই কৌটিই যেন একসঙ্গে কেড়ে নিল তার শেষ আশাটুকু।