ছিনতাইয়ের ২০ ভরি স্বর্ণ একাই নিয়ে এক মাসের ছুটিতে পুলিশ সদস্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৮৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের ৪০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেনসহ চার জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার পর কনস্টেবল জাকির হোসেন ও ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর ভগ্নিপতি মোহাম্মদ আলীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মোহাম্মদ আলীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ছিনতাই হওয়া স্বর্ণের ২০ ভরি। বাকি ২০ ভরি নিয়ে কনস্টেবল জাকির এক মাসের ছুটিতে গিয়েছিলেন। তাকে গ্রেফতার করা হলেও এখনও ২০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

এ ঘটনায় শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী নিঝুম। মামলায় কনস্টেবল জাকির হোসেনসহ তিন জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও একজনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার পর রাতেই এজাহারভুক্ত আসামি কনস্টেবল জাকির হোসেন ও বাদীর ভগ্নিপতি মোহাম্মদ আলীকে গ্রেফতার করা হয়। মোহাম্মদ আলীর বাড়ি থেকেই সাড়ে ২০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কনস্টেবল জাকির হোসেনসহ দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে আজ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলে আসামিদের রিমান্ডের আবেদন করবেন।

কনস্টেবল জাকির হোসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর পুলিশ ফাঁড়ির অফিসার্স মেসে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামপুর গ্রামে। গত ৮ আগস্ট বিকাল ৩টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মরা পাগলা নদীর কালীনগর ব্রিজের পাশে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছিল।

পুলিশ ও মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, গলিত অবস্থায় থাকা ৪০ ভরি স্বর্ণ রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর কাছে পাঠিয়েছিলেন ব্যবসায়ী নিঝুম। তার ভগ্নিপতি মোহাম্মদ আলী স্বর্ণগুলো রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়ে যান। মোহাম্মদ আলীর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চকআলমপুরে।

কনস্টেবল জাকির হোসেন মোহাম্মদ আলীর ছেলে মো. নয়নের বন্ধু। মোহাম্মদ আলী স্বর্ণের চালানটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওই ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়ার দুই মিনিটের মধ্যে সেখানে কনস্টেবল জাকিরসহ দুজন হাজির হন। পরে পুলিশ পরিচয়ে তারা স্বর্ণগুলো নিয়ে চলে যান। ঘটনার পর এক মাসের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যান কনস্টেবল জাকির। ছুটি শেষে কয়েক দিন আগে কর্মস্থলে যোগ দেন। পরে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। মামলার পর পুলিশ লাইনস থেকেই গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, গ্রেফতার মোহাম্মদ আলী পুলিশকে ২০ ভরি স্বর্ণ দেওয়ার সময় জানিয়েছেন, বাকি ২০ ভরি স্বর্ণ কনস্টেবল জাকির হোসেনের কাছে আছে। তিনিই স্বর্ণের চালানটির বিষয়ে জাকিরকে জানিয়েছিলেন। স্বর্ণ হস্তান্তরের পর জাকির অভিযানের নামে ওই স্বর্ণ নিয়ে যান। পরে ৪০ ভরি স্বর্ণ তারা ভাগাভাগি করে নেন বলেও মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন। তবে কনস্টেবল জাকির এখনও ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেননি। তার কাছে থাকা বাকি ২০ ভরি স্বর্ণও এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি।

ঘটনার দিন সিসি ক্যামেরার ফুটেজে কনস্টেবল জাকিরসহ দুই জনকে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল নিয়ে কালীনগর ব্রিজের দিকে যেতে দেখা যায়। এ ছাড়া ঘটনার দিন, আগের দিন ও পরদিন মোহাম্মদ আলী ও তার ছেলে নয়নের সঙ্গে জাকিরের মোবাইল ফোনে অসংখ্যবার কথা হয়েছে। এর মধ্যে ঘটনার দুই দিন আগে ৬ আগস্ট জাকির তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর থেকে নয়নের নম্বরে ১০ বার কথা বলেন। ৭ আগস্ট ঘটনার আগের দিন একই নম্বরে ২৫ বার এবং মোহাম্মদ আলীর নম্বরে সাতবার কথা বলেন। ঘটনার দিন ৮ আগস্ট জাকির ও নয়নের মধ্যে ১০ বার এবং মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে ১১ বার কথা হয়। তবে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের পরদিন নয়ন কিংবা তার বাবা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে জাকিরের আর কোনও কথা হয়নি।

স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনা জানাজানি হলে কনস্টেবল জাকিরকে প্রত্যাহারের পাশাপাশি জেলা পুলিশের সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াসির আরাফাতকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। এর মধ্যেই ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মামলা করলে জাকিরসহ দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ছিনতাই হওয়া স্বর্ণের অর্ধেক। বাকি স্বর্ণ উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ জানান, কনস্টেবল জাকির হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করতে চিঠি প্রস্তুত করা হয়েছে। পুলিশ সুপার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় আছেন। তিনি ফেরার পর সাময়িক বরখাস্তের আদেশে স্বাক্ষর করবেন। মোহাম্মদ আলী স্বর্ণ বের করে দিলেও কনস্টেবল জাকির এখনও তার কাছে থাকা স্বর্ণ দেননি। ওই স্বর্ণ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।