ব্যস্ততম সড়কের পাশে স্তূপ করে ফেলা হয়েছে পৌর শহরের বর্জ্য। রোদ-বৃষ্টিতে পচে এসব বর্জ্য থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, তৈরি হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বর্জ্যের স্তূপে খাবার খুঁজছে কুকুর, বিড়াল ও বিভিন্ন পাখি। দুর্গন্ধে পথচারীদের কেউ নাক চেপে রাস্তা পার হচ্ছেন, কেউবা দম বন্ধ করে দ্রুত সেখান থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
বর্জ্য ফেলার নির্ধারিত ভাগাড় বা ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় এমন পরিস্থিতির শিকার নাটোরের বড়াইগ্রাম পৌরসভার বাসিন্দারা। শুধু বড়াইগ্রাম নয়, জেলার আটটি পৌরসভাতেই কমবেশি একই চিত্র। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পৌরসভা হলেও একটিতেও পূর্ণাঙ্গ ডাম্পিং ব্যবস্থা নেই। ফলে শহরের বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এতে শহরের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে আশপাশের গ্রাম ও জনপদের পরিবেশ।
নাটোর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে। বাংলাদেশের প্রাচীনতম পৌরসভাগুলোর একটি এটি। পরে পৌরসভাটি ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সিংড়া পৌরসভাও ‘ক’ শ্রেণির। এ ছাড়া গুরুদাসপুর পৌরসভা এবং বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া ও বড়াইগ্রাম পৌরসভাও ‘ক’ শ্রেণির। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত নলডাঙ্গা পৌরসভা এখনো ‘গ’ শ্রেণিতে রয়েছে। লালপুরের গোপালপুর পৌরসভা দ্বিতীয় শ্রেণির এবং ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাগাতিপাড়া পৌরসভা তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদায় রয়েছে।
সড়কের পাশে বর্জ্য, মরছে গাছ
সরেজমিনে দেখা গেছে, বড়াইগ্রাম ও বনপাড়া পৌরসভার বর্জ্য শহরের বাইরে নিয়ে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের পাশে ফেলা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের একেবারে ধার ঘেঁষে বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়কের পাশের গাছপালাও। ইতিমধ্যে খেজুর ও তালগাছসহ অন্তত ছয়টি গাছ মারা গেছে। এরপরও পৌরসভার বর্জ্যবাহী গাড়ি নিয়মিত সেখানে বর্জ্য ফেলছে।
বর্জ্য ফেলার কারণে জনদুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বড়াইগ্রাম পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের জন্য সরকারি খাসজমি খোঁজা হচ্ছে। জমি পাওয়া গেলেই ডাম্পিং স্টেশন তৈরি করা হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গুরুদাসপুর পৌরসভার বর্জ্য শহরের বাইরে ধারাবাড়িষা ইউনিয়নের হরিজন পল্লীতে নিয়ে ফেলা হচ্ছে। এসব সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় পথচারীদের নাক চেপে চলতে হয়। দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে কেউ কেউ বমিও করেন। এ পৌরসভার বর্জ্য নন্দকূজা নদীর তীরেও ফেলা হয়েছে। এতে আশপাশের এলাকার বাতাস দূষিত হচ্ছে।
নাটোর সদর, সিংড়া, নলডাঙ্গা, গোপালপুর ও বাগাতিপাড়া পৌরসভাতেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আসাদ মোল্লা, হাজী মোহাম্মদ সামি, শাহাবুদ্দিন বলেন, পৌর শহরের বর্জ্য ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রামগুলোতে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে বহুবার অভিযোগ দিয়েও কোনও প্রতিকার মেলেনি। স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা না করেই পৌর কর্তৃপক্ষ বর্জ্য ফেলা অব্যাহত রেখেছে। দুর্গন্ধে তারা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।
কোথাও সড়কের পাশে, কোথাও হাটের ভেতরে
গুরুদাসপুর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদা আফরোজ বলেন, ‘গুরুদাসপুর পৌরসভার জন্য নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জমি নির্ধারণের পর ডাম্পিং স্টেশনের অনুমোদন পাওয়া গেছে। শিগগিরই কাজ শুরু হবে। ডাম্পিং স্টেশন নির্মিত হলে পৌরসভার বর্জ্যের কারণে মানুষের দুর্ভোগ কমবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাগাতিপাড়া পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে পেরাবাড়িয়া সড়কের পাশে। মালঞ্চি বাজারের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে হাটশেডের ভেতরে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, হাটের ভেতরে ও সড়কের পাশে বর্জ্য ফেলার কারণে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। দুর্গন্ধে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সিংড়া পৌর শহরের চাঁদপুর এলাকায় জমা করা হয় বর্জ্য। সেখানে বর্জ্যের স্তূপ বড় হয়ে গেলে তা সরিয়ে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের জোলারবাতা এলাকায় ফেলা হয়। এতে পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বাড়ছে। নাটোর সদর ও নলডাঙ্গা পৌরসভার বর্জ্যও একইভাবে বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে।
ডাম্পিং স্টেশন তৈরির উদ্যোগ
স্থানীয় সরকার বিভাগের নাটোরের উপপরিচালক শামীম হোসেন বলেন, ‘পৌরসভার সব কার্যক্রম চললেও বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট ভাগাড় নেই। পৌরবাসীর জন্য এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। জনপ্রতিনিধিরা যুগ যুগ ধরে এভাবেই চালিয়ে এসেছেন। কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ নিরসনে পৌরসভার নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবেননি। এখন প্রতিটি পৌরসভার জন্য নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে।’
শামীম হোসেন আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে গুরুদাসপুর পৌরসভার জন্য ডাম্পিং স্টেশনের অনুমোদন হয়েছে। বড়াইগ্রামের জন্যও জমি খোঁজা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি পৌরসভার ডাম্পিং স্টেশনের চাহিদা পূরণ হবে। এ বিষয়ে ঢাকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেছেন তিনি। পর্যায়ক্রমে সব পৌরসভায় ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা হবে।’