সড়ক পথে কুড়িগ্রাম থেকে রংপুরের দূরত্ব মাত্র ৫০ কিলোমিটার। তবে এই ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে ভোগান্তি আর দুর্ভোগের শেষ নেই যাত্রীদের। সিটিং সার্ভিসের নামে চলছে যাত্রী প্রতারণা। বছরের পর বছর এমন চললেও এর থেকে পরিত্রাণের কোনও উপায় মিলছে না সাধারণ যাত্রীদের। ফলে পরিবহন মালিকদের কাছে একরকম জিম্মি হয়ে পড়েছে উত্তর জনপদের লোকজন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কে মেইল এবং লোকাল সার্ভিস মিলে প্রায় ৭০টি মিনিবাস চলাচল করে। এর মধ্যে ৩৪টি বাস চলে সিটিং মেইল হিসেবে। বাকিগুলো লোকাল। তবে সিটিং সার্ভিসের গাড়িগুলো সিটিংয়ের কথা বললেও চলতি পথে অতিরিক্ত যাত্রী তোলে। এ কাজের জন্য মোটর মালিক সমিতির বিধিমালায় জরিমানার বিধান থাকলেও তা কার্যকর করতে খোদ কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদাসীনতা দেখা যায়।
এছাড়া সিটিং সার্ভিসের নামে ভাড়া ৮০ টাকা নেওয়া হলেও চলছে লোকাল গাড়ির মতোই। সরকার সর্বশেষ তেলের মূল্য কমালেও এই রুটে পরিবহন ভাড়া এক পয়সাও কমায়নি পরিবহন মালিক সমিতি।
বাসগুলোর আসন এতটাই সংকীর্ণ যে তাতে বসে পা রাখতে ভীষণ কষ্ট হয় যাত্রীদের। প্রতিটি গাড়িতেই নির্ধারিত আসন সংখ্যার চেয়ে ১০/১২টি আসন বেশি রয়েছে। আবার বাসগুলোর মানও খারাপ, কতগুলোর আবার ফিটনেসবিহীন। কিন্তু এই রুটে বিকল্প কোনও পরিবহন না থাকায় বাধ্য হয়েই এভাবে চলাচল করতে হয় সাধারণ যাত্রীদের।
গন্তব্যে পৌঁছাতে এক ঘণ্টা ২০ মিনিটের কথা বললেও সময় লাগে ঘণ্টা দেড়েক। যাত্রাপথে বিভিন্ন স্টপেজ থেকে যাত্রী উঠানো ও নামার ক্ষেত্রে সুপারভাইজারদের কাছে নানা হয়রানির শিকার হতে হয় বলে বেশ কিছু যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
এ নিয়ে কথা হয় রংপুর থেকে কুড়িগ্রামে আসা নিহার রঞ্জন ও ইউনুস নামে দুজন যাত্রীর সঙ্গে। তারা জানান, বাসগুলোর যে অবস্থা তাতে এগুলোতে যাতায়াত করার চেয়ে হেঁটে যাওয়াই ভালো। কিন্তু আমরা অপারগ। এই বাসগুলোতে চড়লে মনে হয় এগুলো দেখবার জন্য কোনও কর্তৃপক্ষ নেই। টাকা খরচ করেও আমরা কোনও সেবা পাচ্ছি না।
তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা এদের (পরিবহর মালিকদের) কাছে জিম্মি হয়ে রয়েছি। কবে মুক্তি মিলবে কে জানে!’
রংপুর ডেন্টাল কলেজের শিক্ষার্থী মঞ্জুরি, বাসা কুড়িগ্রাম। প্রতি সপ্তাহে তাকে কুড়িগ্রাম যেতে হয়। তার অভিযোগ, মহিলা আসনে একইসঙ্গে পুরুষদের বসাতেও দ্বিধা করে না বাসের স্টাফরা। এক্ষেত্রে কোনও মহিলা আপত্তি জানালে উল্টো বাস থেকে তাকে নেমে যাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। বিড়ম্বনা এড়াতে তখন মহিলা যাত্রীরা চুপ করে মেনে নিতে বাধ্য হন।
যাত্রীসেবার এমন দুরাবস্থার কথা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মোটর মালিক সমিতির এক সদস্য বলেন, ‘প্রতিটি গাড়িতেই নির্ধারিত আসনের চেয়ে প্রায় ১০-১২টি অতিরিক্ত আসন রয়েছে। রাস্তায় শ্রমিক ইউনিয়নের নামে যে পরিমাণ চাঁদাবাজি হয়, তাতে অতিরিক্ত আসন এবং অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন না করলে ব্যবসা করা সম্ভব না।’
শ্রমিক ইউনিয়নকে কী পরিমাণ অর্থ প্রতিদিন দিতে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কুড়িগ্রাম থেকে রংপুর যাতায়াতের পথে বিভিন্ন স্পটে ৩৫০/৪০০ টাকা দিতে হয়। এছাড়া প্রতিমাসে গাড়ি প্রতি পুলিশকে দিতে হয় ৪০০/৫০০ টাকা। এছাড়া রোড পার্মিট ও ফিটনেস বাবদ বিআরটিএ কর্মকর্তাদের বাৎসরিক মোটা অংকের টাকা দিতে হয়। এতসব অতিরিক্ত টাকা দিতে হলে আমাদেরকে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করতে হবে এটাই স্বাভাবিক।’ বিআরটিএ কর্মকর্তাদের বাড়তি টাকা দেওয়ার ঝামেলা এড়াতে অনেকে গাড়ির কাগজ হালনাগাদ করা থেকে বিরত থাকেন বলে জানান মালিক পক্ষের এই সদস্য।
বিআরটিএ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলতে সংস্থাটির কুড়িগ্রাম জেলার সহকারী পরিচালকের সঙ্গে মোবাইলফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
মালিক সমিতির অপর এক সদস্য নিম্নমানের যাত্রীসেবার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা চাই যাত্রীরা ভালো সেবা পাক। কিন্তু মহাসড়কে যেভাবে অটোরিকশা এবং থ্রি-হুইলার চলাচল করছে তাতে বাসের যাত্রী সংকট দেখা দেয়। এতে করে একটি গাড়ি তার সব আসন পুরো করে যাত্রা করতে পারে না। ফলে যাত্রাপথে লোক পেলে তারা উঠাবে এটাই স্বাভাবিক। আর এসব অটোরিকশা এবং থ্রি-হুইলারের জন্য বাসের চালকরা রাস্তায় ঠিকমত গাড়ি চালাতেও পারে না। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতেও দেরি হয়। সরকার মহাসড়ক থেকে এসব অটোরিকশা এবং থ্রি-হুইলার তুলে নিলে যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধিসহ সড়ক দুর্ঘটনাও কমে যাবে বলে জানান তিনি।
কুড়িগ্রাম-রংপুর মোটর মালিক সমিতির সড়ক সম্পাদক রায়হান কবির বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সাধ্যমতো চেষ্টা করছি সেবার মান বৃদ্ধি করতে। বর্তমানে আগের চেয়ে সেবার মান বৃদ্ধিও পেয়েছে। সিটিং সার্ভিসে অতিরিক্ত যাত্রী নিলে আমাকে অভিযোগ করলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্ত গাড়ির সিরিয়াল বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা করেছি। এজন্য টিকিট কাউন্টারের পাশে আমার ফোন নম্বর দেওয়া রয়েছে যাতে যাত্রীরা আমাকে অভিযোগ জানাতে পারে।’
তিনি আরও জানান, কুড়িগ্রাম-রংপুর রুটে মোট ৩৪টি গাড়ি সিটিং সার্ভিসে চলাচল করে। এর মধ্যে ১৭টি কুড়িগ্রাম মালিক পক্ষের এবং ১৭টি রংপুর মালিক পক্ষের। কুড়িগ্রামের গাড়িগুলোর মান উন্নত করলেও রংপুরের মালিকদের গাড়ি আগের মতোই রয়েছে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ ব্যবস্থা নিলে অনেকাংশে তা কার্যকর হতে পারে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ একইসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির প্রেসিডেন্ট, উত্তরবঙ্গ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব এবং রংপুর জেলা মটর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক।
কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন ও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আসনে যাত্রী পরিবহনের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে কুড়িগ্রাম ট্রাফিক ইনসপেক্টর আতাউর রহমান বলেন, ‘এগুলো প্রতিরোধের জন্য আমরা প্রায়ই মোবাইল কোর্ট বসিয়ে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি।’ তবে বাস মালিকদের কাছে মাসিক চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
আরও পড়ুন
বন উজাড়, ধ্বংসের মুখে অর্ধশতাধিক ছড়া-ঝিরি
স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও রায়পুরে লিয়াকত আলী খানের নামে স্কুল!
বাসাবো বৌদ্ধ মন্দিরে সম্প্রীতির ইফতার
/এসটি/এএইচ/