বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে গাইবান্ধা জেলায়। জেলার যে তিনটি বড় হাট সপ্তাহে দু’দিন মানুষের ভিড়ে গমগম করতো সেগুলোর ওপর দিয়ে এখন চলছে নৌকা। পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে দেড়শ’ স্কুলে। ভেঙে গেছে দেড় হাজার বাড়ি-ঘর, ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও তিন হাজার বাড়ি। ৩৩টি ইউনিয়নের ৫৬ হাজার মানুষ এ মুহুর্তে পানিবন্দি। এরচেয়েও মারাত্মক খবর হচ্ছে, শহররক্ষার ঘাঘট বাঁধটি ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টি গাইবান্ধা শহরে মাইকিং করে প্রচার করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে শহরবাসীও এখন পানি ওঠার আশঙ্কায় রয়েছেন।
গাইবান্ধার বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় গাইবান্ধা শহররক্ষা ঘাঘট বাঁধ ও ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁধের শতাধিক পয়েন্ট মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এদিকে বৃহস্পতিবার সাঘাটার ভরতখালী ইউনিয়নের ভাঙ্গামোড়-কাতলামারী ভেড়িবাঁধের কাতলামারী পয়েন্টে ভাঙন দেখা দেওয়ায় সাঘাটার ভাঙ্গমোড়, কুকরাহাট ও দক্ষিণ কাতলামারী গ্রাম এবং ভরতখালি কালিমন্দিরের সামনে পাকা সড়ক ভেঙে গেছে। এতে ভরতখালি বাজার নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি হাট, তহশিল অফিস, ফুলছড়ি হাট বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। হাটের ওপর দিয়ে এখন চলছে নৌকা। জেলার বৃহত্তম ওই হাট তিনটি পানিতে ডুবে যাওয়ায় এসব এলাকার মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেচাকেনা বন্ধ হয়ে গেছে।
অপরদিকে ফুলছড়ি-সাঘাটা-গাইবান্ধা সড়কের ২০টি পয়েন্টে সড়কের ওপর দিয়ে তীব্র বেগে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যানবাহনসহ চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয় চত্বর ও বিদ্যালয় ভবন পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় জেলায় পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে দেড়শ’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের।
গত বুধবার রাতে পাউবোর পক্ষ থেকে বাঁধ ঝুঁকিতে থাকার বিষয়ে গাইবান্ধা শহরে মাইকিং করে এলাকাবাসীকে সতর্ক থাকতে বলার পর শহর জুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এক কথায় জেলার বন্যা কবলিত আড়াই লক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে দিনযাপন করছেন।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ কুমার সরকার জানান, বৃহস্পতিবার ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৮৬ সেন্টিমিটার এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি ১৩ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। গাইবান্ধা শহররক্ষা ঘাঘট বাঁধ ও ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁধের শতাধিক পয়েন্ট মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বুধবার রাতে পাউবোর পক্ষ থেকে বাঁধ ঝুঁকিতে থাকার বিষয়ে গাইবান্ধা শহরে মাইকিং করে এলাকাবাসীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, স্থানীয় লোকজন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্মিলিতভাবে বালির বস্তা ফেলে এসব এলাকা রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, পানি অব্যাহত থাকায় এ পর্যন্ত জেলার বন্যা কবলিত সাঘাটা, ফুলছড়ি, সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নের ২ শত ২৩টি গ্রামের দুই লাখ ৫৬ হাজার ৫৭৩ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সরকারিভাবে জেলার পানিবন্দি মানুষদের জন্য ফুলছড়ি, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও সদর উপজেলায় ৪৬টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তিন হাজার ৪২টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত ও ভাঙনে এক হাজার ৬৫৮টি ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে।
তিনি আরও জানান, বন্যায় ১৫৪ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক বিধ্বস্ত ও ৬০৩টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম জানান, বন্যা কবলিত এলাকার বিদ্যালয়ে পানি ওঠায় জেলার ১৪৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন আকতার জানান, ২৫টি হাইস্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজের পাঠদান বন্ধ আছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ আ কাম রুহুল আমিন জানান, তলিয়ে গেছে ১৮ হাজার ৭শ’ ১২ হেক্টর জমির শাক-সবজি, আমন বীজতলা, রোপা আমন ও আউশ ধান।
গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শামসুল আজম বলেন, এ পর্যন্ত তিনশ’ মেট্রিক টন চাল, ৫ লাখ টাকার মজুত শুকনা খাবার ও ২ লাখ নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তাছাড়াও বন্যার্তদের মাঝে চাল, ডালসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রাখা হয়েছে। কিন্তু চাহিদা অনেক বেশি থাকায় অতিরিক্ত ত্রাণের চাহিদা জানিয়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: রাজবাড়ীতে পদ্মার পানি বিপদসীমার ৬০ সে.মি. ওপরে
/টিএন/আপ-এআর/