সড়ক ও জনপথ সূত্রে জানা গেছে, জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলা সদর থেকে ৬ কি. মি. পূর্ব দিকে উপজেলার পাইকেরছড়া ইউনিয়নে অবস্থিত ৪০০ মিটার দীর্ঘ পুরনো সোনাহাট ব্রিজ (সাবেক রেল ব্রিজ) থেকে ৪১৩ মিটার ভাটির দিকে (দক্ষিণে) নতুন এই সেতুটি নির্মাণ করা হবে। ৬০৪ দশমিক ৬৭৬ মিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩৬ কোটি ২৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।
ইতোমধ্যে সেতুটি নির্মাণের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) ওপর মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ যাচাই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে (২৭ আগস্ট/১৭)। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পূণর্গঠিত ডিপিপি প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন।
আগামী ২০২০ সালে সেতুর বাস্তবায়ন কাজ সম্পন্ন হবে বলে জানা গেছে। সেতুটি নির্মাণ শেষ হলে সোনাহাট স্থল বন্দরে পণ্য আমদানি-রফতানি স্থবিরতা কেটে ওঠার পাশাপাশি ভূরুঙ্গামারী ও নাগেশ্বরী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগ বিড়ম্বনার অবসান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুধকুমার নদের ওপর নতুন সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সোনাহাট স্থলবন্দর আমদানি-রফতানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, বর্তমান সেতুটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যেকোনও মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেতুর অভাবে স্থলবন্দরে পণ্য আমদানি অনেক কম। যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে বাইরে থেকে কোনও ক্রেতা বন্দরে পণ্য ক্রয় করতে আসতে চান না। নতুন সেতু নির্মাণ হলে বন্দরে বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। আমরা আরও বেশি বেশি পণ্য আমদানি করতে পারবো। পাশাপাশি দুধকুমার নদের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ইউনিয়নগুলোর কয়েক লাখ মানুষের যোগাযোগ ভোগান্তি দূর হবে।
সোনাহাট স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জামান আহমেদ জানান, সেতুর অভাবে স্থলবন্দরের কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে বাইরে থেকে কোনও ব্যবসায়ী বন্দরে ব্যবসা করতে আসছেন না। এই সেতু নির্মাণ হলে আবারও গতি পাবে স্থলবন্দরের কার্যক্রম।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের খবরে উত্তরের জনগণের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন জানান, প্রধানমন্ত্রী কুড়িগ্রামের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তার প্রতিশ্রুত এই সেতু নির্মাণের খবর শুধু কুড়িগ্রাম নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্যও সুখবর। এর ফলে সোনাহাট স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে, এ অঞ্চলে শিল্প বিকাশে সুযোগ পাবে।
লিংকন আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী কুড়িগ্রামে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার যে ঘোষণা দিয়েছেন এই যোগাযোগ উন্নয়ন সেটাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। এটা নিশ্চিত রূপে কুড়িগ্রামবাসীর জন্য আনন্দের খবর।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ,কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল বরকত মো. খুরশীদ আলম জানান, এটি প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত প্রকল্প। সয়েল টেস্ট, হাইড্রোলজিক্যাল এবং মরফোলজিক্যাল স্টাডির পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স পাওয়া গেছে। এখন মন্ত্রণালয় ও একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরও জানান, প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৮ সাল নাগাদ সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করে ২০২০ সালে সেতুটি সড়ক যোগাযোগের জন্য খুলে দেওয়া হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলা সদর থেকে ৬কি. মি. পূর্বে উপজেলার পাইকেরছড়া ইউনিয়নে ৪০০ মিটার দীর্ঘ সোনাহাট ব্রিজ (সাবেক রেল সেতু) অবস্থিত। ১৮৮৭-তে ইংরেজরা লালমনিরহাট থেকে ভুরুঙ্গামারী হয়ে ভারতের মনিপুররাজ্যে চলাচলের জন্য গোয়াহাটি পর্যন্ত যে রেলপথ স্থাপন করে তারই অংশ হিসাবে দুধকুমার নদের ওপর সোনাহাট রেলওয়ে ব্রিজ তৈরি করা হয়। ১৯৭১-এমহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা এই ব্রিজের একটি অংশ ভেঙে দেয়। পরবর্তীকালে আশির দশকে ব্রিজটি মেরামত করা হয়। বর্তমানে এটি সাধারণ ব্রিজের মতোই ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রতিবছর বন্যায় সংযোগ সড়কের বিভিন্ন অংশে ধ্স, দীর্ঘদিন ধরে ব্রিজের সংস্কার না হওয়া এবং ব্রিজের ওপর দিয়ে বিভিন্ন ভারি যান চলাচলসহ সোনাহাট স্থলবন্দর চালুর পর পাথর ও কয়লা বোঝাই ট্রাক চলাচলের কারণে ব্রিজটি বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সেতুটি রক্ষার দাবিতে স্থানীয়রা বিভিন্ন সময় মানববন্ধন করে আসছিল। ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর কুড়িগ্রাম সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় দুধকুমার নদের ওপর একটি সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। তার এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবেই সোনাহাট সেতু নির্মাণ হতে যাচ্ছে।