স্বপ্ন দেখাচ্ছে হাকিমপুরে উদ্ভাবিত ‘কন্যাশিশু সুরক্ষা সেল’

বাংলাহিলি-২ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নিরাপদে লেখাপড়া করছে সম্প্রতি দেশ জুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এমন অবস্থায় কন্যাশিশু নিপীড়ন বন্ধে দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের উদ্ভাবিত ইনোভেশন আইডিয়া ‘কন্যাশিশু সুরক্ষা সেল’ বিভাগীয় অথবা জাতীয় পর্যায়ে রেপ্লিকেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের ২৩ আগস্ট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের এক বৈঠকে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত ইনোভেশন কার্যক্রমসমূহের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও ২০২০-২১ অর্থবছরে আইডিয়া বক্সে জমাকৃত ইনোভেশন আইডিয়াগুলো যাচাই বাছাই করে হাকিমপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কতৃক উদ্ভাবিত ‘কন্যাশিশু সুরক্ষা সেল’ জাতীয় অথবা বিভাগীয় পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে রেপ্লিকেশনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

যার আলোকে ‘কন্যাশিশু সুরক্ষা সেল’ নামে একটি সফটওয়্যার করা হয়েছে। যেখানে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা কর্মকর্তা, পুলিশ, হাসপাতাল, মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন সেবার টোল ফ্রি নাম্বার সংযুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বিলবোর্ডে টোল ফ্রি হট নাম্বারগুলো দেওয়া হয়েছে।

এদিকে উদ্যোগটির বেশ সুফল পাচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ তাদের অভিভাবকেরা। বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে, কিংবা বিদ্যালয়ে গিয়ে কোনও কন্যাশিশু নীপিড়নের শিকার হলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রিক গঠিত ‘কন্যাশিশু সুরক্ষা সেল’ কমিটির সদস্যরা। আইনগত সাহায্যের পাশাপাশি সামাজিক হয়রানির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে নীপিড়নের শিকার পরিবারগুলো। এই উদ্যোগের ফলে কমেছে কন্যাশিশু নিপীড়নের ঘটনা।

চলতি বছরের মার্চের নিপীড়নের শিকার তিনটি কন্যাশিশুর অভিভাবকরা জানান, তাদের শিশুরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে নীপিড়নের শিকার হয়েছিলেন। এ সময় বাংলাহিলি-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘কন্যাশিশু সুরক্ষা সেল’ এর দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষক উম্মে ওয়াহিদা ও সহকারী শিক্ষক খাতুনে জান্নাতের মাধ্যমে তারা আইনগত সহায়তা পেয়েছেন। ওই দুই শিক্ষক ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তাদের শিশুদের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়াসহ পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং সর্বক্ষণ সমস্ত বিষয়গুলো মনিটরিং করেছে। যার ফলে অপরাধীদের গ্রেফতার করা সহজ হয়েছিল। তাদের প্রচেষ্টার কারণে শিশুরা বিদ্যালয় থেকে ঝরে না পড়ে নিয়মিত লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাহিলি ২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেলের দায়িত্বে নিয়োজিত সহকারী শিক্ষক খাতুনে জান্নাত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাচ্চাদের একা বাহিরে না দিতে, সাবধানে রাখতে, যত্ন নেওয়াসহ অন্য বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা নিয়মিত শিশুদের অভিভাবকদের অবহিত করছি। একইসঙ্গে কোনও শিশু নিপীড়নের ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে অবহিত করাসহ এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা রয়েছে। আমার বিদ্যালয়ে এ ধরনের দুটি ঘটনা ঘটে। বিষয়টি শিশুরা আমাকে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তপক্ষকে অবহিত কিরে প্রধান শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে চলে যাই। একইসঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের প্রশাসন দ্বারা গ্রেফতার করাতেও সক্ষম হই।

হাকিমপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মাসুদুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগের নির্দেশনায় ইনোভেশন কার্যক্রমের আওতায় সুরক্ষা সেলের আইডিয়া বের করি। হাকিমপুর উপজেলার সবগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আইডিয়াটি এক বছর যাবৎ পাইলট প্রকল্প হিসেবে চলছে। অধিদফতর থেকে এটিকে পর্যবেক্ষণ করছে। এক বছর ধরে চলার পর সফল হওয়ার কারণে এটিকে তারা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অধিদফতর থেকে আমার কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল। আমি সে মোতাবেক কার্যক্রমগুলো উপস্থাপন করি। এরপর তারা আমার আইডিয়াটি সিলেক্ট করে। এরপর এটিকে অধিদফতরে পাঠায় জাতীয় অথবা বিভাগীয় পর্যায়ের সকল বিদ্যালয়ে রেপ্লিকেশনের জন্য। বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের অপরাধ ঘটলেও মানুষ এ সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। মূলত আমাদের উদ্দেশ্য এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা। আমাদের লক্ষ্য বাচ্চাদেরকে সচেতন করা, অভিভাবকদের সচেতন করা, যাতে এই ঘটনাগুলো না ঘটে। যদি ঘটে যায় সেক্ষেত্রে যেন থানায় গিয়ে সহায়তা পান সেজন্য আমরা থানার সঙ্গে যোগাযোগ করি, শিক্ষকরা সঙ্গে করে নিয়ে যাই। চিকিৎসকের কোনও সহযোগিতা লাগলেও ইউএনও স্যারের মাধ্যমে নিশ্চিত করি। এই কার্যক্রমের ফলে হাকিমপুরে কন্যাশিশুর প্রতি সকল প্রকার নীপিড়ন প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, চলতি বছরের মার্চ মাসে উপজেলায় তিনটি কন্যাশিশু নীপিড়নের শিকার হয়। সুরক্ষা সেলের মাধ্যমে তিনটি পরিবারকেই আইনগত সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। একইসঙ্গে ওই তিনটি শিশুকেই আমরা স্কুলে নিয়ে আসতে পেরেছি। তারা কেউ ঝরে পড়েনি।