করোনা মহামারিতে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘ প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় শ্রেণিপাঠদান বন্ধ ছিল। দীর্ঘ এই সময়ে টেলিভিশনের পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ক্লাস চালু রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা তাদের অভিভাবকের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হয়েছে। তবে সেই দিকে শহরের তুলনায় পিছিয়ে ছিল গ্রামের শিক্ষার্থীরা। ইন্টারনেটের ধীরগতি, পড়াশোনায় অবহেলাসহ উপকরণের অভাবেও অনলাইন ক্লাসের সুবিধা বঞ্চিত হয়েছে অধিকাংশ শিক্ষার্থী। অন্তত কুড়িগ্রাম জেলার সদর, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলার চরাঞ্চলসহ জেলার বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান করে এমনই চিত্র পাওয়া গেছে।
কুড়িগ্রাম জেলা শহরেই বাস করেন কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের এক শিক্ষার্থী। দ্বাদশ শ্রেণির মানবিক শাখায় অধ্যায়নরত এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘জুম অ্যাপে আমাদের অনলাইন ক্লাস চলতো। একদিন ঢুকে দেখি পাঁচ জন অংশ নিয়েছে, আর একদিন দেখি কেউ নাই। পরে আর অনলাইনে ক্লাস করি নাই।’ ওই শিক্ষার্থী জানান, শুধু তিনি নন, তার সহপাঠীরাও অনলাইন ক্লাসে তেমন আগ্রহী ছিলেন না।
কলেজ শিক্ষার্থীদের অনেকেই ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ এবং জ্ঞান থাকলেও স্কুল শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে আরও পশ্চাৎপদ।
জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য মতে, জেলায় ২০২১ সালে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোট ৪ হাজার ৩৩১টি এবং ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত মোট ৩৪২টি অনলাইন ক্লাস নেওয়া হয়েছে।
জেলা সদরের মোঘলবাসা ইউনিয়নের মোঘলবাসা দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির বিজ্ঞান শাখায় উপস্থিত (৫ মার্চ) ৩৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় শুধু একজনের। সুমাইয়া আক্তার বাধন নামে ওই শিক্ষার্থী জানায়, তার মায়ের ফোনে দুই একদিন অনলাইন ক্লাস করলেও পরে আর অনলাইন ক্লাস করা হয়নি। বাকি শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে জানেই না, কারও অনলাইনে যুক্ত হওয়ার উপকরণও নেই। আর নবম শ্রেণির মানবিক শাখায় উপস্থিত ১৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়া কাউকে পাওয়া যায়নি। দশম শ্রেণিতে ক্লাসে উপস্থিত ৪৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৪ শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে যারা ৪/৫ দিন অনলাইনে ধারণকৃত (রেকর্ডেড) ক্লাস করেছে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের রলাকাটার চরের বাসিন্দা ও ওই ইউনিয়নের চাকেন্দা খাঁন পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোসলেমা আক্তারসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণাই নেই। চরাঞ্চলের ওই এলাকার স্কুল শিক্ষার্থীদের স্মার্ট ফোনতো দূরের কথা তাদের বাড়িতে টেলিভিশনও নেই।
বাড়িতে টেলিভিশন নেই কেন জানতে চাইলে এক স্কুল শিক্ষার্থীর অভিভাবক সুফিয়া বেগম বলেন, ‘চরের মধ্যে টিভি কী করি!’
উলিপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের প্রায় চার শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য একটি মাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় খুদিরকুটি আব্দুল হামিদ উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা জানেই না অনলাইন ক্লাস কী? গত দুই বছরে তারা কখনও অনলাইন ক্লাসে অংশও নেয়নি। ওই স্কুলের ৭ম শ্রেণির ছাত্রী হেনা ও রুমি জানায়, তারা অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে জানে না। তাদের নিজের কিংবা অভিভাবকদের স্মার্ট ফোন নেই। হেনার কথায়, ‘বাড়িতে টিভি নাই, টাচ ফোনও (স্মার্টফোন) নাই। আমরা অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে জানি না। শুধু অ্যাসাইনমেন্ট করে স্কুলে জমা দিয়েছি।’
স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখা হয় ৭ম ও ৮ম শ্রেণির ছাত্রী লিপি, আশামনি ও শিউলির সঙ্গে। তারা একটি প্রতিষ্ঠানে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরছিল। ২২ ফেব্রুয়ারি স্কুল খোলার খবরও পায়নি তারা। আর অনলাইন ক্লাস করেছে কি না জানতে চাইলে তারা বলে, ‘অনলাইন ক্লাস কী, জানি না। ইন্টারনেট ব্যবহার করতেও পারি না। বন্ধের সময় প্রাইভেট পড়ে ক্লাসের পড়া আগায় নিছি।’
উপকরণের অভাব, আছে অনাগ্রহ
চিলমারী উপজেলার থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা কেউই অনলাইন ক্লাসে অংশ নেয়নি। ইন্টারনেটের ধীরগতি, উপকরণ না থাকা এবং সরাসরি শিক্ষকের সঙ্গে কথোপকথন করার সুযোগ না থাকায় তারা অনলাইন ক্লাসে আগ্রহী ছিল না। একই রকম কারণ জানায়, ওই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও।
কথা হয় উলিপুর উপজেলার মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সাথে। জান্নাতুল ফেরদৌস নামে একজন জানান, ‘দুই একদিন ক্লাসে অংশ নিয়েছিলাম কিন্তু ভালো লাগেনি। শিক্ষকের সাথে সরসরি কথা বলার সুযোগ নেই, প্রশ্নও করার সুযোগ নেই। তাই আমি আর অংশ নেইনি।’ আর নিজেদের স্মার্ট ফোন না থাকায় অনলাইন ক্লাসে আগ্রহী হননি বলেও জানান তার সহপাঠীরা।
‘শ্রেণি পাঠদান চালু থাক‘
প্রথম ধাক্কায় দুই বছর বন্ধ থাকার গেল বছর ১২ সেপ্টেম্বর সীমিত পরিসরে শুরু হয় শ্রেণি পাঠদান। তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে ওমিক্রনের প্রভাবে দ্বিতীয় দফায় বন্ধ ঘোষণা করা হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রায় এক মাস বন্ধ থাকার পর গত ২২ ফেব্রুয়ারি আবারও খুলে দেওয়া হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
কুড়িগ্রামের এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বলছেন, দীর্ঘ দিন স্কুল বন্ধ থাকায় তাদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। উপকরণ এবং পারিবারিক স্বচ্ছলতার অভাবে তারা অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারেনি। শারীরিক উপস্থিতিতে ক্লাসে অংশ নেওয়া তাদের জন্য সহজ এবং এটাই উপযুক্ত। তারা চায়, যেকোনও পরিস্থিতিতে বিশেষ ব্যবস্থায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলমান থাকুক।
‘স্কুল বন্ধ থাকায় আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। অনলাইন ক্লাসের জন্য বিশেষায়িত ট্যাব এবং দ্রুত গতির ও ফ্রি ইন্টারনেট সুবিধা প্রয়োজন। তা না হলে কেউ অনলাইন ক্লাসের সুবিধা পাবে, আবার কেউ বঞ্চিত হবে’ বলেন চিলমারীর থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ইশরাত জাহান ইন্না ও তার সহপাঠীরা। অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে একই মন্তব্য পাওয়া গেছে।
উলিপুরের খুদিরকুটি আব্দুল হামিদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক খন্দকার আশরাফুল আলম বলেন,‘অনলাইন ক্লাস এসব অঞ্চলের (চরাঞ্চল) জন্য কার্যকরী নয়। এসব এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল। অভিভাবকদের অধিকাংশের স্মার্ট ফোন তো দূরের কথা, বাড়িতে টিভিও নাই।’ কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ করেন শিক্ষকরা।
যা বলছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিইও) শামসুল আলম বলেন, ‘কুড়িগ্রাম একটি অনগ্রসর এলাকা। এখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অভিভাবক দরিদ্র সীমার নিচে বাস করেন। বেশিরভাগ বাবা-মায়ের স্মার্ট ফোন নেই। এটা একটা বড় সমস্যা। আবার অনেকের থাকলেও ডাটা কেনার সামর্থ নেই। ফলে অনেক শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারে নাই এবং তারা পিছিয়ে পড়েছে। ’
‘অনেক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা গেছে তাদের বাবা-মা নানা শঙ্কায় তাদের হাতে ফোন দিতে চান না। ফোন ব্যবহার করে ছেলে-মেয়ে বিপথে যায় কিনা, অভিভাবকরা এমন আশঙ্কা করেন। এমন নানাবিধ সমস্যা নিয়ে চলতে হচ্ছে।’
চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসের সুফল পায়নি উল্লেখ করে ডিইও বলেন, ‘কুড়িগ্রামে প্রায় চার শতাধিক চর রয়েছে। এসব চরে ইন্টারনেট সুবিধা পাওয়া যায় না। আমরা বিভিন্ন মিটিংয়ে এসব বিষয় নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।’
ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সরাসরি পাঠদানের পাশাপাশি অনলাইনেও ক্লাস আপলোড দেওয়া চলমান রয়েছে। কোনও শিক্ষার্থীর প্রয়োজন হলে এর থেকে সাহায্য নিতে পারবে বলেও জানান ডিইও।