ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ২৮ বছর 

দিনাজপুরে ৮ মাসে ধর্ষণ-নির্যাতনের ঘটনায় ৯১১ মামলা

দিনাজপুরের ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস আজ। ১৯৯৫ সালের এই দিনে কাহারোল উপজেলার দশমাইলের অদূরে বিপথগামী কিছু পুলিশ সদস্যের হাতে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয় কিশোরী ইয়াসমিন। ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে সেসময় আন্দোলন গড়ে তুলেছিল জেলার সাধারণ মানুষ। সে আন্দোলনে গুলি চালিয়ে সাত জনকে হত্যা করেছিল পুলিশ। এতে আহত হন অনেকে। সেদিনের ঘটনা সবাইকে নাড়া দেয়। এরই মধ্যে ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত তিন পুলিশ সদস্যের ফাঁসি হলেও জেলায় নারী নির্যাতন কমেনি; বরং বেড়েই চলেছে। গত দুই বছর আট মাসে জেলায় নারী-শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে তিন হাজার ৫৬২টি। যা প্রতি মাসে ১১১টি। 

দিনাজপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা যায়, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৯১১টি। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ১৮৭ ও ধর্ষণচেষ্টার ৫৫টি, বাকিগুলো নির্যাতনের। ২০২২ সালে মামলা হয়েছিল এক হাজার ৩৭৫টি; যা প্রতি মাসে ১১৪ দশমিক ৫৮টি। ২০২১ সালে মামলা হয়েছিল এক হাজার ২৭৬টি; যা প্রতি মাসে ১০৬ দশমিক ৩৩টি। এই হিসাবে প্রতি বছরই বাড়ছে মামলার সংখ্যা। অর্থাৎ বাড়ছে নারী নির্যাতনের ঘটনা।

জেলা রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে জেলায় মোট বিয়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৯৬৪টি। এর মধ্যে মুসলিম বিয়ে ১৩ হাজার ৫১৬টি ও হিন্দু বিয়ে ৪৪৮টি। একই সময়ে জেলায় তালাক হয়েছে পাঁচ হাজার ৮১০টি। যা মাসে প্রায় ১৬টি। এসব তালাকের অধিকাংশই নারী নির্যাতনকে কেন্দ্র করে ঘটেছে।

এদিকে, ইয়াসমিন হত্যার ২৮ বছর পার হলেও মেয়ের জন্য এখনও চোখের জল ফেলেন মা। তিনি বলেন, ‘ইয়াসমিনের মতো পরিণতি যেন আর কোনও মেয়ের না হয়। ইয়াসমিনের খুনিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা এখনও বন্ধ হয়নি। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যার প্রতিটি ঘটনা জনসমক্ষে আসুক। প্রতিটি ঘটনায় দায়ীরা যেন ইয়াসমিনের খুনিদের মতো দৃষ্টান্তমূলক শান্তি পায়। প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের সুষ্ঠু এবং দ্রুত বিচার হলে এসব ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, যাতে এসব ঘটনা আর না ঘটে, সেজন্য প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।’

দিনাজপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) তৈয়বা বেগম বলেন, ‘ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক এটাই আমাদের চাওয়া। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখি, এসব ঘটনায় অনেকে আপস-মীমাংসা করে নেন, তখন কষ্ট হয়। দ্রুত সময়ে এসব ঘটনার বিচার হোক এটা আমরাও চাই। এজন্য কাজ করছি, জড়িতদের বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করছি।’

নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোর বিচার দ্রুত সময়ের মধ্যে করা গেলে ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে জানালেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক লোকমান হাকিম। তিনি বলেন, ‘একইসঙ্গে পারিবারিক সচেতনতার প্রয়োজন আছে। পরিবার সচেতন হলে অনেকাংশে নারী ও শিশু নির্যাতন কমবে।’

নারী নির্যাতন বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথা জানালেন ইয়াসমিন আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দিনাজপুর-১ আসনের এমপি মনোরঞ্জন শীল গোপাল। তিনি বলেন, ‘সবার সম্মিলিত ও সর্বাত্মক প্রতিবাদের কারণে ইয়াসমিনের ধর্ষক ও হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। তবে এখনও নারী নির্যাতন বন্ধ হয়নি। নারী নির্যাতন বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস উপলক্ষে নগরীর দশমাইল মোড়ে ইয়াসমিনের স্মৃতিসৌধে আজ কয়েকটি সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ, কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে মহিলা পরিষদ ছাড়াও জেলার বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৫ সালের এই দিনে কিশোরী ইয়াসমিন ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া নৈশকোচে দিনাজপুরের দশমাইল মোড় এলাকায় পৌঁছায়। এ সময় কোতোয়ালি পুলিশের টহল দল তাকে বাড়ি (শহরের রামনগরে) পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে পিকআপভ্যানে তুলে নেয়। পথে পুলিশ সদস্যরা কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণ করে। পরে নির্মমভাবে হত্যা করে তার লাশ দশমাইল মহাসড়কের পাশে ফেলে দেয়। পরদিন বর্বরোচিত এ ঘটনার প্রতিবাদে দিনাজপুরের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। এ সময় পুলিশের গুলিতে সাত জন প্রাণ হারান। আহত হন কমপক্ষে শতাধিক। বিক্ষুব্ধ মানুষ দিনাজপুর শহরের থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন। প্রশাসন অসহায় হয়ে পড়ে। শহরে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। পরে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনকে প্রত্যাহার করা হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বরে ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিন পুলিশ সদস্যের ফাঁসি হয়। এ ঘটনায় আন্দোলনকারী দিনাজপুরবাসীর ওপরে গুলি চালানোর অপরাধে তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দিনাজপুর বিশেষ জজ আদালতে একটি মামলা করা হয়। ওই মামলার কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত আছে। 

এ বিষয়ে জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মারুফা বেগম বলেন, ‘ওই মামলার কার্যক্রম গত ১০ বছর ধরে স্থগিত হয়ে আছে। আমরা চাই মামলাটি পুনরায় চালু করা হয়। সেইসঙ্গে ঘটনায় জড়িতরা শাস্তি পাক।’