রানি এলিজাবেথ কীভাবে খেলেন হাজারি গুড়

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী হাজারি গুড় দুই শতাব্দী ধরে ঐতিহ্য বহন করছে। অনন্য স্বাদের জন্য এটি বিখ্যাত। একাধারে সুস্বাদু ও দৃষ্টিনন্দন হওয়ায় ইতোমধ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। ব্রিটিশ রানিও এই গুড়ের স্বাদ গ্রহণ করে প্রশংসা করেছিলেন।

এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- খেজুরগাছের রস থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে হাতে তৈরি এই গুড়ের স্বাদে ও মানে অনন্য। হাতে নিয়ে চাপ দিতেই এই গুড় গুঁড়া গুঁড়া হয়ে যায়। সুনাম ছড়িয়ে আছে দেশের বাইরেও। এ কারণে এই গুড়ের নামেই জেলার ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে, ‘হাজারি আর বাউলগান, মানিকগঞ্জের আসল প্রাণ’। 

রাজকীয় প্রশংসা

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি ও গাছিদের ভাষ্যমতে, একসময় ঝিটকার হাজারি গুড় দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও পরিচিতি পায়। জনশ্রুতি রয়েছে, ইংল্যান্ডের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথও এই গুড়ের স্বাদ গ্রহণ করে প্রশংসা করেছিলেন। যদিও এ বিষয়ে লিখিত প্রমাণ নেই, তবে এই গল্প এখনও স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে।

কীভাবে এই গুড় পেলেন রানি

প্রবীণ গাছিরা জানিয়েছেন, ভারতে এসে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ উপহার হিসেবে গুড়টি পেয়েছিলেন। চমৎকার সাদাটে রঙ, মনমাতানো সুঘ্রাণ এবং স্বাদ পেয়ে তিনি অত্যন্ত মুগ্ধ হন ও এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। রানির এই প্রশংসার পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও হাজারি গুড়ের নামডাক রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ে।

প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ঐতিহ্য বহন করে আসছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার হাজারি গুড়

যেভাবে নামকরণ

হাজারি গুড়ের নামকরণ মূলত এর আদি প্রস্তুতকারক মোহাম্মদ হাজারি প্রামাণিক মতান্তরে মিনহাজ উদ্দিন হাজারি নামের একজন গাছির নামানুসারে হয়েছে। প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশ বছর আগে ঝিটকার শিকদারপাড়া গ্রামে তিনি প্রথম এই বিশেষ গুড় তৈরি শুরু করেন।

অলৌকিক ঘটনা

নামকরণ এবং এর সুখ্যাতি নিয়ে স্থানীয়ভাবে চমৎকার কিছু লোককাহিনি ও ইতিহাস প্রচলিত আছে। এর মধ্যে একটি দরবেশের অলৌকিক ঘটনা। প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, একবার বিকালে হাজারি প্রামাণিক খেজুরগাছে হাঁড়ি বেঁধে মাত্রই নিচে নেমেছেন। এমন সময় এক দরবেশ তার কাছে খেজুরের রস খেতে চান। হাজারি প্রামাণিক বিনয়ের সঙ্গে বলেন যে, হাঁড়ি মাত্রই বাঁধা হয়েছে, তাতে বড়জোর ১০-১৫ ফোঁটা রস জমেছে। তবে দরবেশের পীড়াপীড়িতে তিনি আবারও গাছে ওঠেন এবং অলৌকিকভাবে দেখতে পান যে সম্পূর্ণ হাঁড়িটি মিষ্টি রসে ভরপুর হয়ে গেছে। সেই রস পান করে তৃপ্ত হয়ে দরবেশ হাজারি প্রামাণিককে আশীর্বাদ করে বলেন, ‘তোমার হাতের তৈরি গুড় একদিন জগৎখ্যাত হবে।’ দরবেশের নির্দেশেই গুড়টিকে সাধারণ গুড় থেকে আলাদা করে চেনার জন্য প্রস্তুতকারক তার নিজের নাম অনুসারে নাম দেন হাজারি গুড়।

কীভাবে চিনবেন আসল হাজারি গুড়

দরবেশের পরামর্শেই হাজারি তার তৈরি বিশেষ গুড়ের ওপর নিজের নাম খোদাই করা একটি কাঠের হাজারি সিলমোহর ব্যবহার শুরু করেন। কালের বিবর্তনে আজও ঝিটকা অঞ্চলের গাছিরা হাজারি পরিবারের কাছ থেকে সেই সিলমোহরটি বা ট্রেডমার্কটি ধার নিয়ে গুড়ের ওপর বসিয়ে এর আসল পরিচয় নিশ্চিত করেন।

খেজুরগাছের রস থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে হাতে তৈরি এই গুড়ের স্বাদে ও মানে অনন্য

গুড় তৈরির কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু দেশেই নয়, এই গুড়ের সুনাম ছড়িয়ে আছে দেশের বাইরেও। ব্রিটিশ শাসনামলে ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ ভারতে আসেন। সে সময় মানিকগঞ্জ থেকে উপহার হিসেবে রানির কাছে পাঠানো হয়। এই গুড় খেয়ে রানি ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

হরিরামপুরের ঝিটকা শিকদারপাড়ার (গাছিপাড়া) রহিজ উদ্দিন হাজারির পূর্বপুরুষ ছিলেন হাজারি প্রামাণিক। রহিজ উদ্দিন হাজারি জানান, প্রায় ৩০০ বছর আগে ঝিটকা শিকদারপাড়ার হাজারি প্রামাণিক খেজুরগাছ থেকে মাটির হাঁড়িভর্তি রস পেড়ে বাড়িতে ফিরছিলেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত এক দরবেশ তার হাঁড়ির রস পান করে আত্মতৃপ্তি নিয়ে বলেন, ‘এই রসের গুড়ের সুনাম একদিন সবখানে ছড়িয়ে পড়বে।’ এরপর যত দিন যায়, এ রসের গুড়ের স্বাদ ও মান বাড়তে থাকে। হাজারি গুড় নামে পরিচিতি পেতে থাকে।

রহিজ হাজারি জানান, একটা সময় শতাধিক পরিবার এই গুড় তৈরির কাজ করতো। এখন ২০ থেকে ২৫টি হাজারি পরিবার বংশপরম্পরায় যুক্ত রয়েছে উৎপাদনের সঙ্গে। মোজাফফর হোসেন তাদের একজন।

চাহিদা বেশ, উৎপাদন কম

মোজাফফর জানান, তীব্র শীতে স্বচ্ছ রসে হাজারি গুড়ের মান ও স্বাদ ভালো হয়। প্রায় ১২ কেজি রসে এক কেজি গুড় হয়। প্রতি কেজি গুড় ১ হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়। চাহিদাও বেশ। তবে খেজুরগাছ কমে যাওয়ায় রস সংগ্রহ ও গুড় উৎপাদন কমে গেছে। এ ছাড়া রয়েছে জ্বালানির সংকটও।

গুড় তৈরির নানা কারিশমা

গুড় তৈরির নানা কারিশমা রয়েছে। এগুলো হলো ধৈর্য্য, পরিশ্রম, সততা। এসবের কোনটির ঘাতটি থাকলে শত বছরের সুনাম ধরে রাখা যেতো না। এই মূলমন্ত্র মননে ধারণ করে হাজারি গুড় তৈরি করে যাচ্ছে ওসব পরিবার। প্রতি এক হাড়ি রসের জন্য আলাদা আলাদা জ্বাল করতে হয়। এরপর তা একটি মাটির পাত্রে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ফুটন্ত রস ছেঁকে ঢেলে দেওয়া হয় একটি খাড়া মাটির পাত্রে। যা জালা নামে পরিচিত। ওই জালার দুই পাশে দুজন ব্যক্তি বসেন কাঠ কিংবা তালের লাঠি নিয়ে। এরপর ওই দুজনে মিলে অসংখ্য বার ঘুটা দিতে দিতে ধবধবে সাদা বাদামি রং তৈরি করেন। তারপর তৈরি হয় সুস্বাদু হাজারি গুড়। 

ঝিটকা এলাকার গুড় প্রস্তুতকারী রহিজ উদ্দিন ও মোজাফফর হোসেন জানান, জিআই সনদ পাওয়ায় হাজারি গুড়ের সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। এতে নকল পণ্যের বিস্তার রোধ করা সহজ হবে এবং প্রকৃত উৎপাদকেরা লাভবান হবেন। একইসঙ্গে বিদেশে রফতানির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।

ঐতিহ্যবাহী এই হাজারি গুড় ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে

মোজাফফর হোসেন জানান, দাদা বেলায়েত মোল্লার সময় থেকে তাদের বাড়িতে হাজারি গুড় তৈরি হয়ে আসছে। বিশেষত্ব এর উৎপাদন প্রক্রিয়ায়। সাধারণ খেজুরের রস থেকেই এটি তৈরি হয়। কিন্তু তৈরির কৌশল একেবারেই আলাদা। প্রায় ১২ কেজি খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় মাত্র ১ কেজি হাজারি গুড়। তাই এর দামও সাধারণ গুড়ের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার টাকায়।

পাওয়া যায় কোথায়

ঝিটকা, বাল্লা, গোপীনাথপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে বংশপরম্পরায় কিছু পরিবার এই গুড় তৈরি করে। একসময় শতাধিক পরিবার তৈরি করলেও এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি পরিবারে।

গোতপনাথপুর গ্রামের হাজারি গুড়ের কারিগর মোহম্মদ রসেল বলেন, ‘শীতকালের ভোরে আজানের আগেই ঘুম ভাঙে। শীতের সঙ্গে টেক্কা দিতে মোটা কাপড় গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ি খেজুর গাছের দিকে। একের পর এক ৪০-৪৫টি গাছে উঠে নামাতে হয় রসের হাঁড়ি। এরপর বাড়িতে এনে শুরু হয় রস জ্বাল দেওয়ার প্রস্তুতি। জ্বাল দিতে দিতে কয়েক ঘণ্টা পর সেখান থেকে তৈরি হয় হাজারি গুড়।’

জিআই স্বীকৃতি

গত সোমবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) এই গুড়ের জিআই নিবন্ধন সনদ ইস্যু করে। অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন স্বাক্ষরিত জিআই (আর) ফরম-১ এর মাধ্যমে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। নিবন্ধন সনদ অনুযায়ী, ‘মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়’ জেলা প্রশাসক, মানিকগঞ্জের নামে ৩০ শ্রেণিতে জিআই-৬২ নম্বরে নিবন্ধিত হয়েছে। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা হাজারি গুড়ের এই স্বীকৃতির কথা জানান।