হাজারি গুড়ের কেজি ২ হাজার টাকা, কারা খায় কোথায় যায়

মতিউর রহমান, মানিকগঞ্জ
১৮ জুন ২০২৬, ০৯:০১আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০৯:০৪

প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ঐতিহ্য বহন করে আসছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার হাজারি গুড়। খেজুরগাছের রস থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে হাতে তৈরি এই গুড়ের স্বাদে ও মানে অনন্য। পাশাপাশি এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, হাতে নিয়ে চাপ দিতেই এই গুড় গুঁড়া গুঁড়া হয়ে যায়। শুধু দেশেই নয়, এই গুড়ের সুনাম ছড়িয়ে আছে দেশের বাইরেও। এ কারণে এই গুড়ের নামেই জেলার ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে, ‘হাজারি আর বাউলগান, মানিকগঞ্জের আসল প্রাণ’। অবশেষে ঐতিহ্যবাহী এই হাজারি গুড় ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা এ তথ্য জানান।

শীতের সকালের কুয়াশা, খেজুর গাছের মাথায় ঝুলে থাকা মাটির হাঁড়ি আর দূর থেকে ভেসে আসা ধোঁয়ার গন্ধ। এই চিরচেনা গ্রামীণ আবহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকার ঐতিহ্যবাহী হাজারি গুড়। স্বাদ, সুগন্ধ ও তৈরির ব্যতিক্রমী পদ্ধতির জন্য বহুদিন ধরেই দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও পরিচিত এই গুড়। অবশেষে সেই ঐতিহ্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলেছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদফতর (ডিপিডিটি) ঝিটকার হাজারি গুড়কে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ দেয়।

কী থেকে তৈরি হয়

হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা অঞ্চলে বহু বছর ধরেই খেজুরের রস থেকে তৈরি বিশেষ ধরনের গুড়ের জন্য পরিচিত। স্থানীয়ভাবে ‘হাজারি গুড়’ নামে পরিচিত এ পণ্য তার অনন্য স্বাদ, মনমাতানো সুগন্ধ ও ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন পদ্ধতির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমাদৃত। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলের মানুষ খেজুরগাছের রস সংগ্রহ করে বিশেষ কৌশলে এই গুড় তৈরি করে আসছেন।

কারা খায় কোথায় যায়

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি ও গাছিদের ভাষ্য, একসময় ঝিটকার হাজারি গুড় দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও পরিচিতি লাভ করে। জনশ্রুতি রয়েছে, ইংল্যান্ডের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথও এই গুড়ের স্বাদ গ্রহণ করে প্রশংসা করেছিলেন। যদিও এ বিষয়ে লিখিত প্রমাণ নেই, তবে এ গল্প এখনো স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

গুড় তৈরির নানা কারিশমা

গুড় তৈরির নানা কারিশমা রয়েছে। এগুলো হলো ধৈর্য্য, পরিশ্রম, সততা। এসবের কোনটি ঘাটটি থাকলে শত বছরের সুনাম ধরে রাখা ও টিকিয়ে রাখা যেতো না। এই মূলমন্ত্র মননে ধারণ করে হাজারি গুড় তৈরি করে যাচ্ছেন স্থানীয়রা। প্রতি এক হাড়ি রসের জন্য আলাদা আলাদা জ্বাল করতে হয়। এরপর তা একটি মাটির পাত্রে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ফুটন্ত রস ছেঁকে ঢেলে দেওয়া হয় একটি খাড়া মাটির পাত্রে। যা জালা নামে পরিচিত। ওই জালার দুই পাশে দুজন ব্যক্তি বসেন কাঠ কিংবা তালের লাঠি নিয়ে। এরপর ওই দুজনে মিলে অসংখ্য বার ঘুটা দিতে দিতে ধবধবে সাদা বাদামি রং তৈরি করেন। তারপর তৈরি হয় সুস্বাদু হাজারি গুড়। 

হরিরামপুরের ঝিটকা এলাকার গুড় প্রস্তুতকারী রহিজ উদ্দিন ও মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, জিআই সনদ পাওয়ায় হাজারি গুড়ের সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। এতে নকল পণ্যের বিস্তার রোধ করা সহজ হবে এবং প্রকৃত উৎপাদকেরা লাভবান হবেন। একই সঙ্গে বিদেশে রফতানির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।

মোজাফ্ফর হোসেন জানান, দাদা বেলায়েত মোল্লার সময় থেকে তাদের বাড়িতে হাজারি গুড় তৈরি হয়ে আসছে। বিশেষত্ব এর উৎপাদন প্রক্রিয়ায়। সাধারণ খেজুরের রস থেকেই এটি তৈরি হয়। কিন্তু তৈরির কৌশল একেবারেই আলাদা। প্রায় ১২ কেজি খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় মাত্র ১ কেজি হাজারি গুড়। তাই এর দামও সাধারণ গুড়ের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার টাকায়।

খেজুরগাছের রস থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে হাতে তৈরি এই গুড়ের স্বাদে ও মানে অনন্য

যেসব গ্রামে তৈরি হয়

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঝিটকা, বাল্লা, গোপীনাথপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে এখনও বংশপরম্পরায় কিছু পরিবার এই গুড় তৈরি করে যাচ্ছে। তবে একসময় শত শত পরিবার এই পেশায় থাকলেও এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি পরিবারে।

গোতপনাথপুর গ্রামের হাজারি গুড়ের কারিগর মোহম্মদ রসেল বলেন, ‘ভোরের আজানের আগেই ঘুম ভাঙে। শীতের সঙ্গে টেক্কা দিতে মোটা কাপড় গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ি খেজুর গাছের দিকে। একের পর এক ৪০ থেকে ৪৫টি গাছে উঠে নামাতে হয় রসের হাঁড়ি। এরপর বাড়িতে এনে শুরু হয় রস জ্বাল দেওয়ার প্রস্তুতি। সেখান থেকে তৈরি হয় হাজারি গুড়।’

স্থানীয় গাছি পরিবারের গৃহিণী সুফিয়া বেগম বলেন, ‘ভোরে গাছিদের ডেকে তুলি। এরপর চুলা-হাঁড়ি প্রস্তুত করি। রস এলে ছেঁকে জ্বাল দিতে হয়। গুড় তৈরি শেষে আবার সব হাঁড়ি গরম পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হয়। হাজারি গুড় বানানো খুবই কষ্টের কাজ।’ 

স্থানীয় গাছি আমজাদ হোসেন জানান, প্রতিটি হাঁড়ি নিমপাতা দিয়ে গরম পানিতে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হয়। তিন দিন একটানা রস সংগ্রহের পর পাঁচ দিন গাছকে বিশ্রাম দেওয়া হয়। এরপর আবার রস সংগ্রহ শুরু হয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় নাড়া ও কাশবন।

গুড় তৈরির আদিকথা

গোপীনাথপুরের মোজাফ্ফর হাজারি জানান, তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া বিশেষ কৌশলেই এখনও তৈরি হয় হাজারি গুড়। রস দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দেওয়ার পর পরিষ্কার কাপড়ে ছেঁকে একটি বড় মাটির পাত্রে রাখা হয়। স্থানীয় ভাষায় এই পাত্রকে বলা হয় জালা। এরপর দুই পাশে বসে দুজন কারিগর কাঠের লাঠি দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নাড়তে থাকেন। ধীরে ধীরে রসের রং বদলে ধবধবে বাদামি আভা ধারণ করে এবং তৈরি হয় সুগন্ধি হাজারি গুড়।

এলাকায় এই গুড়ের উৎপত্তি নিয়ে একটি লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে, এক দরবেশের আশীর্বাদে এক গাছির হাঁড়ি হঠাৎ রসে ভরে যায়। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয়েছিল অসাধারণ স্বাদের গুড়। সেখান থেকেই নাকি হাজারি গুড়ের যাত্রা।

ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার লড়াই

চাহিদা এত বেশি যে অনেক সময় কয়েক মাস আগেই অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতারা গাড়ি নিয়ে আসেন এই গুড় কিনতে। কিন্তু খেজুর গাছ কমে যাওয়া, জ্বালানির উচ্চমূল্য, শীতের তীব্রতা হ্রাস এবং অতিরিক্ত কুয়াশার কারণে উৎপাদন দিন দিন কমছে।

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, খেজুর গাছ দ্রুত কমে যাচ্ছে। একসময় কয়েকশ পরিবার এই পেশায় ছিল, এখন মাত্র ২০-২৫টি পরিবার টিকে আছে। খেজুর গাছ রোপণে উদ্যোগ না নিলে একদিন হাজারি গুড় শুধু ইতিহাসের পাতাতেই থাকবে।

জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘লোকসংগীত আর হাজারি গুড় মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর। দীর্ঘদিনের চেষ্টা ও পরিশ্রম সফলতা পেলো। এই স্বীকৃতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়কে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। একসময়ের গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য এখন বাংলাদেশের গর্বের খাদ্যপণ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে নিজস্ব পরিচয় পাবে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
খেজুর ও মসলার দাম কমছে
ঈদের তৃতীয় দিনে আহসান মঞ্জিলে দর্শনার্থীদের ভিড়
বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আদিবাসী তরুণদের নেতৃত্বে নতুন উদ্যোগ ইউনেস্কো-ক্রিহ্যাপের 
সর্বশেষ খবর
১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই না, বিল দিচ্ছি দ্বিগুণ
১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই না, বিল দিচ্ছি দ্বিগুণ
ক্যাঙ্গারুর মাংস খাওয়া কি জায়েজ
ক্যাঙ্গারুর মাংস খাওয়া কি জায়েজ
গরমে স্বস্তি দেবে মৌসুমি ফলের রঙিন সালাদ
গরমে স্বস্তি দেবে মৌসুমি ফলের রঙিন সালাদ
ফুটবল থাকবে, কিন্তু এই গল্পটা আর থাকবে না 
ফুটবল থাকবে, কিন্তু এই গল্পটা আর থাকবে না 
সর্বাধিক পঠিত
‘বাক্সের কাঁকড়া’: যে কারণে নিজের পরিবারই আপনার উন্নতিতে অখুশি!
‘বাক্সের কাঁকড়া’: যে কারণে নিজের পরিবারই আপনার উন্নতিতে অখুশি!
প্রধানমন্ত্রী পৌঁছানোর আগেই ভেঙে পড়লো সভামঞ্চের প্যান্ডেল
প্রধানমন্ত্রী পৌঁছানোর আগেই ভেঙে পড়লো সভামঞ্চের প্যান্ডেল
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ৭ দাবির সঙ্গে একমত গভর্নর
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ৭ দাবির সঙ্গে একমত গভর্নর
অবশেষে মাকে নিয়ে সুখবর পেলেন ভোজিনহা
অবশেষে মাকে নিয়ে সুখবর পেলেন ভোজিনহা
সকালে সিলেটে প্রধানমন্ত্রীর বকুনি, বিকালে সংসদে এমপি
সকালে সিলেটে প্রধানমন্ত্রীর বকুনি, বিকালে সংসদে এমপি