কুড়িগ্রামের চিলমারীতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে কুপিয়ে দুই সাংবাদিকের হাত ‘ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা’ ফাঁস হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের এক কর্মচারী দুই সাংবাদিকের হাত কেটে ফেলতে স্থানীয় কিছু যুবকের সঙ্গে চুক্তি করেছেন, এমন একটি স্বীকারোক্তির অডিও প্রকাশ হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তা ও আইনি ব্যবস্থা চেয়ে চিলমারী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন হুমকির শিকার দুই সাংবাদিক। চিলমারী মডেল থানার ওসি নয়ন কুমার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কুপিয়ে হাত ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনাকারী ওই যুবকের নাম হুমায়ুন কবির। তিনি চিলমারী পিআইও অফিসে কার্যসহকারী পদে মাস্টাররোলে (দৈনিক হাজিরা) নিযুক্ত কর্মচারী বলে জানা গেছে। সোমবার সকালে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তির কাছে সাংবাদিকের হাত কেটে ফেলা সংক্রান্ত পরিকল্পনার কথা জানান। তার পরিকল্পনার একটি অডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে।
হুমকির শিকার দুই সাংবাদিক হলেন- কালবেলা পত্রিকার চিলমারী প্রতিনিধি এস এম রাফি ও দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার চিলমারী প্রতিনিধি ফয়সাল হক রকি।
সম্প্রতি উপজেলার টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে তারা নিজ নিজ পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এ নিয়ে অফিস কর্মচারী হুমায়ুনসহ স্থানীয় সুবিধাভোগীরা তাদেরকে বিভিন্নভাবে চাপে ফেলার চেষ্টা করছেন।
পিআইও অফিসের কর্মচারী হুমায়ুনের পরিকল্পনার অডিও ক্লিপে শুনতে পাওয়া যায়, হুমায়ুন রাফি ও রকির ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, ‘চেংড়া বেংড়ার আমার সঙ্গে চুক্তি হইছে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চোটাচুটি হইবে। আমিও থাকমো সঙ্গে। ওই দুই জনের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হয় হাত যাইবে, অন্য কাইয়ো না চোটাইলে আমি চোটামো। আমার চাকরি যায় যাইবে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ওই দুই জনের হাত নামামো।’
অডিওতে হুমায়ুন দাবি করেন, তিনি নিজে কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করেছেন। এ নিয়ে সাংবাদিক রাফি ও রকিকে সংবাদ প্রকশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তাদেরকে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও তারা সংবাদ প্রকাশ করায় তিনি তাদের দুই জনের হাত কেটে ফেলে দেওয়ার জন্য স্থানীয় কিছু ছেলেদের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। প্রয়োজনে তিনি নিজেই তাদের হাত কেটে দেবেন বলেও অডিওতে শোনা গেছে।
জানতে চাইলে অভিযুক্ত হুমায়ুন প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে বলেন, ‘রাগের মাথায় বলে ফেলেছি। আমাকে মাফ করে দেন। যাদের সামনে বলেছি, তারা আমার সঙ্গে বেঈমানি করে এটা ছড়ায় দিছে। এখন আমাক যা করতে বলবেন করবো। যদি ওই দুই জনের পা ধরতে হয় তাও ধরবো।’
এদিকে অডিও প্রকাশ হওয়ার পর নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা করছেন ওই দুই সাংবাদিক। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সোমবার চিলমারী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সাংবাদিক রাফি। অডিও রেকর্ডের একটি কপি চিলমারী মডেল থানার অফিসিয়াল ই-মেইলে ডিজিটাল প্রমাণ হিসেবে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান ভুক্তভোগী সাংবাদিক।
সাংবাদিক এস এম রাফি বলেন, ‘আমাদের জীবন হুমকিতে রয়েছে। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
সংবাদ প্রকাশ না করতে টাকা দেওয়ার বিষয়ে অভিযুক্ত হুমায়ুনের দাবির বিষয়ে রাফি বলেন, ‘এটা অমূলক অভিযোগ। নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য এখন ওরা আমাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটা পিআইও অফিসের ওই চক্রের কাজ।’
চিলমারী সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সাওরাত হোসেন সোহেল বলেন, ‘এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। একই সঙ্গে তদন্ত করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছি।’
পিআইও সোহেল রহমান বলেন, ‘বিষয়টি দেখতেছি।’
চিলমারী থানার ওসি নয়ন কুমার বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’