সারের প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কুড়িগ্রামের কৃষকদের জন্য ‘মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড’ নামে সাময়িক সার বিতরণ কার্ড চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষি বিভাগ। আসন্ন রবি মৌসুমে (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য মার্চ) জেলার কৃষকদের মধ্যে এই কার্ডের মাধ্যমে সার বিতরণ করা হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে চিলমারী উপজেলায় কৃষকদের কার্ড নিবন্ধন শুরু করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, প্রকৃত কৃষকদের সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করে ফসলের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সার বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং কৃষক সেজে সার নিয়ে কালোবাজারি করার সুযোগ বন্ধ হবে।
চলতি আমন মৌসুমে কুড়িগ্রামে সার নিয়ে কৃষকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিতরণে অব্যবস্থাপনা, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (বিএস) ও ডিলার-খুচরা বিক্রেতাদের যোগসাজশে সার বিক্রির অভিযোগ এবং কৃষক নন এমন ব্যক্তিদের সার নেওয়ার কারণে প্রকৃত কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সারের জন্য জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিক্ষোভ, ডিলারের গুদাম থেকে সার লুট, সড়ক অবরোধ এমনকি কৃষি কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাসভিত্তিক নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত সার বরাদ্দ দিয়েও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় সুষ্ঠুভাবে সার বিতরণ ও প্রকৃত কৃষকদের প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ‘মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কৃষকদের তালিকা হালনাগাদ করছে কৃষি বিভাগ
কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ৮৪ হাজার। সর্বশেষ ২০১৪ সালে দেশব্যাপী কৃষি কার্ড প্রস্তুত করা হয়েছিল। এরপর আর তা হালনাগাদ করা হয়নি। এবার রবি মৌসুম শুরুর আগেই জেলার কৃষকদের তালিকা হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিভাগ।
কী থাকবে ‘মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ডে’
কৃষি বিভাগ জানায়, কার্ড বিতরণের আগে সংশ্লিষ্ট ব্লক সুপারভাইজারদের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। ওই তালিকার ভিত্তিতে সাময়িক মেয়াদের ‘মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড’ দেওয়া হবে।
কার্ডে কৃষকের ছবি, নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জমির পরিমাণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকবে। কৃষককে সার দেওয়ার সময় কার্ডে সারের পরিমাণ, ফসলের নাম ও বিতরণের তারিখ উল্লেখ করা হবে। প্রতিবার সার নিতে কৃষককে কার্ড সঙ্গে আনতে হবে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, শুধু জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে সার দেওয়ায় প্রকৃত কৃষক ছাড়াও অনেকে সার নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আগামী রবি মৌসুমে সুনির্দিষ্ট তালিকার ভিত্তিতে “মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড” তৈরি করে কৃষকদের মধ্যে সার বিতরণ করা হবে। এতে কৃষক ছাড়া অন্য কারও সার নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।’
সেপ্টেম্বরে অতিরিক্ত ১ হাজার টন সার বরাদ্দ
কৃষকদের সারের চাহিদা মেটাতে নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে সেপ্টেম্বরে অতিরিক্ত ১ হাজার মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এ মাসে জেলায় নিয়মিত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ৩ হাজার ৮৯৪ মেট্রিক টন।
অতিরিক্ত বরাদ্দসহ চলতি সেপ্টেম্বরে জেলায় ইউরিয়া সারের মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন, যা গত পাঁচ বছরের মাসিক গড় বরাদ্দের মধ্যে সর্বোচ্চ।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর বন্যা না হওয়ায় চরাঞ্চলের কিছু নিচু জমি চাষাবাদের উপযোগী হয়েছে। কৃষকরা সেখানে বিলম্বে আমন এবং রবি মৌসুমের আগাম সবজি চাষ শুরু করেছেন। ফলে সারের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের চাহিদা বিবেচনায় ফসল উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সরকার অতিরিক্ত সার বরাদ্দ দিয়েছে। এসব সার কৃষকদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।