অর্ধশতাধিক লোক নিয়ে একদিনেই রেলের বাংলোসহ ৫০ কোটি টাকার জমি দখলের চেষ্টা নেতার

নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের পাঁচমাথা মোড় অফিসার্স কলোনি এলাকায় রেলওয়ের একটি বাংলোসহ ১ একর ১০ শতক জমি দখলের চেষ্টা করেছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা। রবিবার (০৪ অক্টোবর) সকালে ১১০ নম্বর ভবনের সামনে উঁচু টিন দিয়ে ঘিরে ফেলতে থাকেন অর্ধশতাধিক লোকজন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শহরের পাঁচমাথা মোড় সংলগ্ন শহীদ ক্যাপ্টেন শামসুল মৃধা সড়কে (বিমানবন্দর রোড) সকাল ৮টার দিকে ১১০ নম্বর বাংলোর সামনে অর্ধশতাধিক লোকজন লাল পতাকা টাঙিয়ে দেন এবং উঁচু টিন দিয়ে ঘিরে ফেলতে থাকেন। এ সময় উৎসুক জনতা জড়ো হন। খবর পেয়ে সংবাদকর্মী, রেলওয়ের কর্মকর্তা, শ্রমিকনেতাদের উপস্থিতি দেখে দখলের জন্য আনা মালামাল রেখে ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়েন তারা। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সৈয়দপুর রেলওয়ের ভূসম্পত্তির আওতাধীন ১১০ নম্বর বাংলোর পাশেই ওই জমি। যার বর্তমান বাজার মূল্য ৫০ কোটি টাকার বেশি। পরিত্যক্ত বাংলোটি রেলওয়ের শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের নামে আগেই লিজ নেওয়া আছে। তারপরও সম্পত্তিটি দখলে নিতে বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালীরা একাধিকবার চেষ্টা চালিয়েছে। বিগত দিনে বিটস কোচিং সেন্টারের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দখল করে রাখা হয়। জুলাই আন্দোলনের পর দখলদাররা পালিয়ে যায়। এ অবস্থায় নতুন করে দখলের চেষ্টা চালানো হয়। ক্ষমতাসীন দলের নেতা পরিচয়ে প্রভাবশালী ওই ব্যক্তি কাজটি করেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।

দখলে নিতে আসা কয়েকজন শ্রমিক জানান, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. রানার পক্ষ থেকে এখানে এসেছেন শ্রমিকরা। তিনি (রানা) রেলওয়ের কাছ কাছে জমিটি ইজারা নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন।

১১০ নম্বর ভবনের সামনে উঁচু টিন দিয়ে ঘিরে ফেলতে থাকেন অর্ধশতাধিক লোকজন

শ্রমিক ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. রানার নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক লোকজন সকাল থেকে টিনের চাল ও বাঁশের খুঁটি নিয়ে এসে দখলেরে চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে সংবাদকর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জানতে চান কীসের ভিত্তিতে জায়গাটি দখলে নেওয়া হচ্ছে। এ সময় রানা জানান, রেলওয়ের পাকশী ভূসম্পত্তি বিভাগের কাছ থেকে লিজ নেওয়া হয়েছে। তাই দখলে নিয়ে মার্কেট করা হবে। কিন্তু লিজের কাগজ দেখতে চাইলে তা দেখাতে পারেননি তিনি। 

লিজের বিষয়টি নিশ্চিত হতে স্থানীয় ও পার্বতীপুর এবং পাকশী রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, কাউকে ওই জমি লিজ দেওয়া হয়নি।

খবর পেয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার শ্রমিক সংগঠন বিআরইএলের সভাপতি খাইরুল বাশার ও শ্রমিক কল্যাণ ট্রাস্টের সদ্য নির্বাচিত প্রতিনিধি আবু হাসান ঘটনাস্থলে আসেন। তারা অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সৈয়দপুর কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ককে বিষয়টি জানান।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ, রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগের প্রকৌশলী (এইএন) তৌহিদুল ইসলাম ও সৈয়দপুর রেলের পূর্ত বিভাগের পরিদর্শক (আইওডাব্লিউ) শরিফুল ইসলাম ঘটনাস্থলে এলে রানা ও তার লোকজন চলে যান। পরে লিজ নেওয়ার দাবি করা রানার কাছে কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনিও দেখাতে পারেননি। পরে আসবেন বলে গেলেও আর আসেননি। এরপরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ টিনের চাল ও বাঁশের খুঁটি জব্দ করে। সেইসঙ্গে জায়গাটি রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের নামে বহুতল মার্কেট নির্মাণের জন্য বরাদ্দ মর্মে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়। 

১১০ নম্বর বাংলোর সামনে অর্ধশতাধিক লোকজন লাল পতাকা টাঙিয়ে দেন এবং উঁচু টিন দিয়ে ঘিরে ফেলতে থাকেন

এ বিষয়ে রানা সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, ‘আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন রেলের কর্মকর্তারা। তারা লিজ দেওয়ার সময় বলেছেন দখল বুঝিয়ে দেবেন। তাদের কথামতো আমি সব প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। সে অনুযায়ী সেখানে যাই। কিন্তু সকাল থেকে বারবার কল দেওয়া হলেও উপস্থিত হননি রেলের কর্মকর্তারা। এজন্য জমিটি শ্রমিকদের দিয়ে বেড়া দিয়ে বুঝে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাতে বাধা দেন রেলের কর্মকর্তারা।’

এ বিষয়ে সৈয়দপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর ফরহাদ হোসেন বলেন, ‌‌‘বৈধ লিজ হলে অবশ্যই রেলওয়ের ম্যাজিস্ট্রেট ও রেলের কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে দখল বুঝিয়ে দেবেন। তাছাড়া ওই স্থান রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের নামে বরাদ্দ দেওয়া আছে। একই জায়গা কীভাবে অন্য কাউকে লিজ দেবে রেলওয়ে? আসলে দলের নাম ভাঙিয়ে রানা জমিটি দখল করতে চেয়েছেন।’

সৈয়দপুর জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রেজওয়ান আক্তার পাপ্পু বলেন, ‘বিএনপি বা এর অঙ্গ সংগঠনের নামে কেউ এমন বেআইনি দখলবাজি করলে তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। কারণ দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী কোনোভাবেই অন্যায় ও অপকর্মকে বরদাশত করেন না। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন তিনি।’

পরে দখলের জন্য আনা জিনিসপত্র নিয়ে যান তারা

রেলওয়ে এমপ্লয়িজ সৈয়দপুর কারখানার সাধারণ সম্পাদক ও শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সদ্য নির্বাচিত প্রতিনিধি আবু হাসান বলেন, ‘এই জায়গা রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের বহুতল মার্কেট নির্মাণের জন্য বরাদ্দ নেওয়া। এখন আর কাউকে দখল করতে দেওয়া হবে না। কারণ এটা রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারীদের বৈধ সম্পদ।’

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘যিনি দখল করতে এসেছিলেন তার লিজ যদি সঠিক হতো তাহলে কাগজপত্র দেখাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং পরে ডাকার পরও তাকে পাওয়া যায়নি। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’